অস্ট্রিয়া মধ্য ইউরোপের যুক্তরাষ্ট্রীয় একটি গণপ্রজাতান্ত্রিক ইইউ সদস্য দেশ

ভৌগোলিকভাবে অস্ট্রিয়া পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপের মাঝে হওয়ায় এর রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম

 কবির আহমেদ, ভিয়েনা, অষ্ট্রিয়াঃ স্থলবেষ্টিত অস্ট্রিয়ার উত্তরে জার্মানি ও চেক প্রজাতন্ত্র, পূর্বে স্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরি, দক্ষিণে স্লোভেনিয়া ও ইতালি, এবং পশ্চিমে সুইজারল্যান্ড ও লিকটেন‌ষ্টাইন অবস্থিত। অস্ট্রিয়া মূলত আল্পস পর্বতমালার উপরে অবস্থিত একটি দেশ। দেশটির তিন-চতুর্থাংশ এলাকাই পর্বতময়। অস্ট্রিয়ার আয়তন ৮৩,৮৫৫ বর্গ কিলোমিটার (৩২,৩৭৭ বর্গ মাইল)। অস্ট্রিয়ার বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ৮৯ লাখ।

অস্ট্রিয়ার রাষ্ট্রীয় ভাষা অস্ট্রিয় জার্মান। জার্মানির জার্মান ভাষার সাথে অস্ট্রিয়ার ভাষার উচ্চারণে বেশ পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। অস্ট্রিয়ার সরকার প্রধানকে চ্যান্সেলর (প্রধানমন্ত্রী) ও উপ প্রধানমন্ত্রীকে ভাইস-চ্যান্সেলর হিসাবে সম্বোধন করা হয়ে থাকে।

অস্ট্রিয়ায় একটি সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত আছে।এখানে ৯টি ফেডারেল রাজ্য রয়েছে। এটি ইউরোপের ৬টি দেশের অন্যতম একটি দেশ যারা স্থায়ীভাবে নিরপেক্ষতা ঘোষণা করেছে। অস্ট্রিয়া ১৯৫৫ সাল থেকে জাতিসংঘের এবং ১৯৯৫ থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউর) সদস্য দেশ। অস্ট্রিয়া নিরপেক্ষ দেশ বলে রাজধানী ভিয়েনায় জাতিসংঘের দফতর, আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি কমিশনের সদর দফতর, প্রাকৃতিক তেল উৎপাদনকারী দেশ সমূহের সংস্থা OPEC(ওপেক) এর সদর দফতর সহ আরও অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানও এখানে অবস্থিত।

অস্ট্রিয়া অতীতে হাবসবুর্গ রাজাদের অধীনস্থ একটি বিস্তৃত শক্তিশালী সাম্রাজ্যের প্রাণকেন্দ্র ছিল। ভিয়েনা ছিল সেই সাম্রাজ্যের রাজকীয় রাজধানী। ভিয়েনা এখনও বিশ্বের অন্যতম প্রধান শহর হিসেবে স্বীকৃত। এর রাজকীয় রূপ, অসাধারণ বারোক স্থাপত্য, সঙ্গীত ও নাট্যকলা জগদ্বিখ্যাত। ভিয়েনা বর্তমানে অস্ট্রিয়ার বৃহত্তম শহর ও রাজধানী।

বিশ্বের দুইটি বড় যুদ্ধ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অস্ট্রিয়া সরাসরি সংযুক্ত ছিল। ১৯১৪ সালের ১৮ জুন বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভো শহরে অস্ট্রিয়ার যুবরাজ আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্ডিনান্ড এক সার্বের গুলিতে নিহত হন। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি এই হত্যাকাণ্ডের জন্য সার্বিয়াকে দায়ী করে এবং ওই বছরের ২৮ জুলাই সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এ যুদ্ধে দু’দেশের বন্ধু রাষ্ট্রগুলো ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ে। এতে যোগ দিয়েছিল সে সময়ের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী সকল দেশ। এভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) সূচনা হয়। তবে অস্ট্রিয়ার যুবরাজের হত্যাকাণ্ডই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের একমাত্র কারণ ছিল না। উনিশ শতকে শিল্পে বিপ্লবের কারণে সহজে কাঁচামাল সংগ্রহ এবং তৈরি পণ্য বিক্রির জন্য উপনিবেশ স্থাপনে প্রতিযোগিতা এবং আগের দ্বন্দ্ব-সংঘাত ইত্যাদিও প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের কারণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে একপক্ষে ছিল উসমানীয় সাম্রাজ্য, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, জার্মানি ও বুলগেরিয়া। যাদের বলা হতো কেন্দ্রীয় শক্তি। আর অপরপক্ষে ছিল সার্বিয়া, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জাপান, ইতালি, রুমানিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যাদের বলা হতো মিত্রশক্তি। এই ১ম বিশ্বযুদ্ধের কারণে তখনকার সময়ে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ৷

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) শেষে অস্ট্রিয়ার অধীনস্থ বহুজাতিক সাম্রাজ্যটি ভেঙে যায় এবং তার স্থানে একাধিক জাতিরাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে। অস্ট্রিয়া নিজে একটি ক্ষুদ্র স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়। নতুন রাষ্ট্রগুলি বাণিজ্য বাধার সৃষ্টি করলে অস্ট্রিয়া তার প্রাক্তন বৈদেশিক বাজার এবং জ্বালানির উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দেশটির অর্থনীতি বৈদেশিক সাহায্যের পর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। অস্ট্রিয়াতে রক্ষণশীল শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ১৯৩০-এর দশকের অর্থনৈতিক মন্দা দেশটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দেয়। যে সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি ভিয়েনাকে সামাজিক গণতন্ত্রের মডেল হিসেবে গড়ে তুলেছিল, ১৯৩৪ সালে তাদের পতন ঘটে এবং ডানপন্থী স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৩৯ সালে নাৎসি জার্মানি অস্ট্রিয়াকে নিজেদের সাথে সংযুক্ত করে নেয়। জার্মানির স্বৈরশাসক এডলফ হিটলারের জন্মস্থান জার্মানির সীমান্তবর্তী অস্ট্রিয়ার Oberösterreich(OÖ) রাজ্যের Braunau জেলায়। হিটলার ৯ বছর বয়সেই মা-বাবার সাথে জার্মানি চলে যায় এবং সেখানেই স্থায়ী হয়ে যায়। তবে তার বংশের লোকজন এখনও অস্ট্রিয়াতেই আছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-১৯৪৫) জার্মানির পরাজয়ের পর মিত্রশক্তি অস্ট্রিয়াকে দশ বছর দখল করে রেখেছিল। এই দশ বছর যৌথ সামরিক কমান্ডারে অধীনে অস্ট্রিয়ার সরকার পরিচালিত হত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,সোভিয়েত ইউনিয়ন,ফ্রান্স ও বৃটেনের সেনারা সময় এখানে অবস্থান করছিল। রাজধানী ভিয়েনাকে চারভাগে বিভক্ত করে মিত্রশক্তির চার দেশ অবস্থান নেয়। তৎরূপ তারা অস্ট্রিয়ার বাকী অংশকেও চার ভাগে বিভক্ত করে শাসন করতে থাকেন।

১৯৫৫ সালে অস্ট্রিয়া আবার স্বাধীন হয় এবং তারপর থেকে দেশটির অভাবনীয় অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটে। বর্তমানে দেশটি একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য। রপ্তানি ও পর্যটন শিল্প দেশটির আয়ের বড় উৎস। ভিয়েনার সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এবং অস্ট্রিয়ার অসাধারণ সৌন্দর্যময় পার্বত্য ভূদৃশ্যাবলীর টানে এখানে বহু পর্যটক বেড়াতে আসেন।

অস্ট্রিয়ার আদি ইতিহাস:

অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা শহরের প্রাণকেন্দ্রে প্রায় ২,০০০ হাজার বছর পূর্বের রোমান সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ এখনও বিদ্যমান আছে। দানিউব(Donau) নদীর তীরবর্তী ভিয়েনা সে সময় রোমান সাম্রাজ্যের একটি শক্তিশালী দুর্গ হিসাবে প্রসিদ্ধ ছিল। সে সময় ভিয়েনার নাম ছিল Vindovona। তাছাড়াও অস্ট্রিয়ার Tirol রাজ্যের আল্পস পর্বতমালায় নব্বইয়ের দশকে বরফের নীচে প্রায় ৫,০০০ বছরের পুরাতন মানুষের মমি পাওয়া গেছে। প্রাপ্ত জায়গার নামানুসারে এই মমির নাম রাখা হয়েছে Ötzi। বর্তমানে এটি Tirol রাজ্যের Innsbruck মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় সংরক্ষিত আছে। Ötzi বর্তমানে অস্ট্রিয়ার ভূখণ্ডে পাওয়া গেলেও তার ডিএনএ পরীক্ষার সাথে ইতালির দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের মানুষ সাদৃশ্য বা মিল বেশী খুঁজে পাওয়া গেছে। সে হিসাবে অস্ট্রিয়াকে একটি প্রাগৈতিহাসিক দেশ হিসাবেও ধরা হয়ে থাকে।তবে আধুনিক অস্ট্রিয়ার গোড়াপত্তন বা ইতিহাস শুরু হয় ৯৭৬ সালে। ঐ বছর লেওপোল্ড ফন বাবেনবের্গ বর্তমান অস্ট্রীয় এলাকার বেশির ভাগ অংশের শাসকে পরিণত হন। ১২৭৬ সালে রাজা প্রথম রুডলফ হাব্‌স্‌বুর্গ বংশের প্রথম রাজা হিসেবে অস্ট্রিয়ার শাসক হন।

হাব্‌স্‌বুর্গ রাজবংশের রাজারা প্রায় ৭৫০ বছর অস্ট্রিয়া শাসন করেন। রাজনৈতিক বিবাহ সম্পাদনের মাধ্যমে হাব্‌স্‌বুর্গেরা মধ্য ইউরোপের এক বিরাট এলাকা দখলে সক্ষম হন। তাদের ভূসম্পত্তি এমনকি আইবেরীয় উপদ্বীপ (বর্তমান স্পেন) পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ১৬শ ও ১৭শ শতকে উসমানীয় সাম্রাজ্যের আক্রমণের ফলে অস্ট্রীয় এলাকাটি ধীরে ধীরে দানিউব নদীর অববাহিকার কেন্দ্রীয় ইউরোপীয় অংশটিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

১৮৪৮ সালে প্রথম ফ্রান্‌ৎস ইয়োজেফ সিংহাসনে আরোহণ করেনে এবং ১৯১৬ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। তার আমলে অস্ট্রীয় ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে। ১৮৬৭ সালে অস্ট্রীয় সাম্রাজ্যের ভেতরে হাঙ্গেরি আগের চেয়ে বেশি রাজনৈতিক স্বাধীনতা পায়, ফলে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় দ্বৈত রাজ্যব্যবস্থার আবির্ভাব ঘটে। ২০শ শতকে এসে রাজনৈতিক টানাপোড়েন বৃদ্ধি পায় এবং ১ম বিশযুদ্ধ শেষে সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে। ঐ সময় অস্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র স্বাধীনতা ঘোষণা করে, যার সীমানা ও বর্তমান অস্ট্রিয়ার সীমানা মোটামুটি একই রকম। ১৯১৯ সালে সাঁ জেরমাঁ-র চুক্তির ফলে হাব্‌স্‌বুর্গ রাজবংশ সরকারিভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং অস্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯১৮ থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত অস্ট্রিয়াতে রাজনৈতিক সংঘাত বৃদ্ধি পায়। ১৯২০-এর দশকের শেষে এবং ১৯৩০-এর দশকের শুরুতে আধা-সামরিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলি হরতাল ও সহিংস সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। বেকারত্বের হার বেড়ে ২৫% হয়ে যায়। ১৯৩৪ সালে একটি কর্পোরেশনবাদী স্বৈরাচারী সরকার ক্ষমতায় আসে। ১৯৩৪ সালের জুলাই মাসে অস্ট্রীয় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক (নাৎসি) দল কু-এর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। ১৯৩৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জার্মানির সামরিক আগ্রাসনের হুমকির মুখে অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর কুর্ট শুশনিগ অস্ট্রীয় নাৎসিদের সরকারে নিতে বাধ্য হন। ১৯৩৮ সালের ১২ই মার্চ জার্মানি অস্ট্রিয়াতে সৈন্য পাঠায় এবং দেশটিকে জার্মানির অংশভুক্ত করে নেয়। এই ঘটনাটির ঐতিহাসিক নাম দেয়া হয়েছে আন্‌শ্লুস (জার্মান ভাষায় Anschluss)। সেসময় বেশির ভাগ অস্ট্রীয় এই আনশ্লুস সমর্থন করেছিল।

১৯৩৮ সালের মার্চ থেকে ১৯৪৫ সালের এপ্রিলের মধ্যে অস্ট্রিয়ার অধিকাংশ ইহুদীকে হয় হত্যা করা হয় অথবা নির্বাসনে যেতে বাধ্য করা হয়। সিন্তি, জিপসি, সমকামী এবং অন্যান্য রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্ব্বীদেরও একই পরিণাম ঘটে। ১৯৩৮ সালের আগে অস্ট্রিয়াতে ২ লক্ষ ইহুদী বাস করত। ১৯৩৮ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে এদের অর্ধেকের বেশি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। জার্মানরা ইহুদীদের ব্যবসা ও দোকানপাটে লুটতরাজ চালায়। প্রায় ৩৫ হাজার ইহুদীকে পূর্ব ইউরোপে গেটো বা বস্তিতে পাঠানো হয়। প্রায় ৬৭ হাজার ইহুদীকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো হয়; যুদ্ধশেষে এদের মাত্র ২ হাজার বেঁচে ছিল।

১৯৪৫ সালে জার্মানির পরাজয়ের পর মিত্রশক্তিরা অস্ট্রিয়াকে চারভাগে ভাগ করে। ১৯৫৫ সালের ২৫শে অক্টোবর নাগাদ এরা সবাই অস্ট্রিয়া ত্যাগ করে এবং অস্ট্রিয়া পূর্ণ স্বাধীনতা পায়। পরবর্তীতে ১৯৬৫ সাল থেকে অস্ট্রিয়া ২৬ অক্টোবরকে তার স্বাধীনতা দিবস হিসাবে ঘোষণা করে এবং দিবসটিকে নিয়মিত পালন করে আসছে ।

কবির আহমেদ, লেখক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট  

 14,591 total views,  1 views today