আজ মহান বিজয় দিবস

 মাহবুবুর রহমানঃ ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস । বাংলাদেশটি আমরা এমনি এমনি পাইনি। এই দেশটি পাওয়ার একটি সুদীর্ঘ ইতিহাস আছে। একসময় আমরা পাকিস্তানের অংশ ছিলাম। আমরা জন্ম থেকে দেখে এসেছিলাম পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্থান অর্থাৎ পাকিস্থান তাই মেনে নিয়েছিলাম। এখন নিশ্চয়ই সবাই চোখ কপালে তুলে বলে, এটি কীভাবে সম্ভব ? একটি দেশের দুই টুকরো দুই জায়গায়, মাঝখানে হাজার কিলোমিটার দূরত্ব? সেটিই ছিল আজব স্থান পাকিস্তান! জনসংখ্যায় আমরাই ছিলাম বেশি অথচ সম্পদের বড় অংশ ভোগ করতো পশ্চিম পাকিস্তান। পুরো দেশটিই যে ছিল ষড়যন্ত্রের জোড়াতালি দিয়ে তৈরি করা একটি দেশ সেটি বুঝতে বাঙালিদের মাত্র কয়েকটি বছর সময় লেগেছিল— যখন পাকিস্তানের স্থপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা এসে ঘোষণা দিয়ে গেলেন- ‘উর্দু এবং শুধুমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। বায়ান্ন সালে ভাষা আন্দোলন হলো, রক্ত দিয়ে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করতে হলো। চুয়ান্ন সালে বঙ্গবন্ধু আর সহকর্মীরা প্রাদেশিক নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে সরকার গঠন করলেন কিন্তু বছর ঘোরার আগেই সেই সরকারকে বাতিল করে দেওয়া হলো। বঙ্গবন্ধু তখন একজন তরুণ রাজনৈতিক নেতা কিন্তু তার বুঝতে বাকি রইল না যে পাকিস্তানের এই ষড়যন্ত্র থেকে মুক্তিলাভের একটিমাত্র উপায় সেটা হচ্ছে স্বায়ত্তশাসন। তিনি ছয়দফার আন্দোলন শুরু করেন। 

এই দেশের নতুন প্রজন্মের যারা দেশকে নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে তাদের সবার এই ছয়টি দফা একবার হলেও পড়ে দেখা উচিত, তাহলে তারা অবাক হয়ে আবিষ্কার করবে যে ছয়দফা আসলে একটিমাত্র দফা, যার আসল অর্থ হচ্ছে স্বাধীনতা!

পাকিস্তানে তখন আইয়ুব খানের সামরিক শাসন, বঙ্গবন্ধু আর তার সহকর্মীরা বেশিরভাগ সময়েই জেলখানায় থাকেন। রাজনৈতিক নেতাদের বলতে গেলে কেউই বাইরে নেই, ছাত্ররা আন্দোলন করে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করে আনল। (আজকাল কেউ কল্পনা করতে পারবে, এখন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ছাত্রলীগ আছে, ক্যাফেটারিয়া-ক্যান্টিনে  বিনা পয়সায় খাওয়ার চেয়ে যারা বড় কিছু চিন্তা করতে পারে না, তাদের পূর্বসূরীরা একসময় কি করে ছাত্র রাজনীতি করেছে ?)

ঊনসত্তুরের বিশাল গণ-আন্দোলনে সামরিক শাসক আইয়ুব খানের পতন হলো, ক্ষমতা দেয়া হলো সর্বকালের নৃশংস দানব ইয়াহিয়া খানের কাছে— তখনো আমরা তার সেই পরিচয়টির কথা জানি না।

সত্তুরের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর ছয়দফার প্রতি স্বীকৃতি জানিয়ে বাঙালিরা তাকে একটা অভূতপূর্ব বিজয় উপহার দেয়। বাঙালিরা প্রথমবার এই দেশের শাসনভার গ্রহণ করবে, পাকিস্তানি মিলিটারির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। তাদের বিশাল ষড়যন্ত্রের  প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী তারা নির্বাচনের রায় অস্বীকার করা মাত্রই সারা দেশ বিক্ষোভে ফেটে পড়ল। বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন, তার অঙুলি হেলনে এই দেশ চলতে শুরু করল। মার্চ মাসের সাত তারিখ রেসকোর্সে তিনি তার সেই ঐতিহাসিক ভাষণটি দিলেন, সেটি শুনলে এখনো আমাদের শরীরে শিহরণ হয়!

২৫ মার্চ পাকিস্তান মিলিটারি এই দেশে  গণহত্যা শুরু করল, ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন, শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ ! সেই যুদ্ধে অনেকের সাথে আমিও যোগ দিলাম মুক্তিযুদ্ধে । আমি তখন ক্লাস নাইনের ছাত্র । সেই দিনের কথা মনে হলে এখনও গাঁ শিহরিয়ে উঠে ।

নয় মাসের সেই যুদ্ধের ইতিহাস হচ্ছে আত্মত্যাগের ইতিহাস, বীরত্বের ইতিহাস আর অর্জনের ইতিহাস। পৃথিবীর কয়টি দেশ এরকম একটি গৌরবের ইতিহাস দাবি করতে পারবে ?

 

 10,244 total views,  1 views today