ঢাকা শহরে দৃশ্যমান হচ্ছে মেট্রোরেল ।

                                                                                                                                                ঢাকা থেকে মোঃ সোয়েব মেজবাহউদ্দিনঃ রাজধানীর যানজট নিরসনে উড়ালসড়ক, বাসের বিশেষ লেন নির্মাণসহ নানা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে বা হচ্ছে। তবে আধুনিক নগর–পরিকল্পনায় ও গণপরিবহনে সবচেয়ে কার্যকর হিসেবে দেখা হয় মেট্রোরেলকে। যানজট নিরসন, বিপুল সংখ্যায় যাত্রী দ্রুত পরিবহনের জন্য উন্নত বিশ্বে মেট্রোরেল সমাদৃত। ঢাকার যানজট নিরসনে সরকার ছয়টি মেট্রোরেল নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে। এগুলোর মধ্যে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ দশমিক ১ কিলোমিটার মেট্রোরেলের কাজের মোট অগ্রগতি নভেম্বর পর্যন্ত ৩৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ। এর মধ্যে উত্তরা থেকে আগারগাঁও অংশের আট কিলোমিটার উড়ালপথ তৈরির কাজ শেষ। জাপানের সহায়তায় এই মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। মেট্রোরেলের জন্য নির্মিত উড়ালপথে রেললাইন বসানো শুরু হচ্ছে এ মাসেই।
 আগামী জুন ২০২০ইং  ইঞ্জিন- কোচ চলে আসার কথা। সেগুলো ঠিকঠাকমতো বসানোর পর শুরু হবে পরীক্ষামূলক চলাচল। সবকিছু পরিকল্পনামতো এগোলে ২০২১ সালের শেষে, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ঢাকাবাসী বহুল প্রতীক্ষিত মেট্রোরেলে চড়তে পারবেন। সরকার ২০০৫ সালে ঢাকার জন্য ২০ বছরের কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) অনুমোদন করে। এতে যানজট নিরসনে ২০২৪ সালের মধ্যে একাধিক মেট্রোরেলসহ নানা প্রকল্প বাস্তবায়নের
পরামর্শ দেওয়া হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে মেট্রোরেল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন গঠন করা হয় ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি (ডিএমটিসিএল)। ২০১৫ সালে জাপানের সহায়তায় এসটিপি সংশোধন (আরএসটিপি) করে মেট্রোরেলের রুট সংখ্যা বাড়ানো হয়। জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের প্রথম আলোকে বলেন, এখন তো মেট্রোরেল দৃশ্যমান। নগর পরিবহনের নতুন এই ব্যবস্থা সংযোজিত হলে ঢাকাবাসী এর সুফল পাবে। তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে আরও পাঁচটি মেট্রোরেল নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে দুটি মেট্রোরেলের প্রস্তুতি অনেক দূর এগিয়েছে। এগুলো বাস্তবায়িত হলে ঢাকার চেহারা পাল্টে যাবে। মানুষকে গর্ব করার মতো কিছু উপহার দিতে পারবে সরকার।
একটি বিশেষ সূত্র বলছে, উত্তরা–মতিঝিল মেট্রোরেলের কাজে আর্থিক ও কারিগরি কোনো বাধা নেই। তবে স্টেশন থেকে ফুটপাতে মানুষ নামার পর যাতে ভিড় না লেগে যায়, সে জন্য বড় জায়গা দরকার। শুরুর পরিকল্পনায় এটা ছিল না। এখন নগরের ব্যস্ত এলাকার স্টেশনগুলোর নিচে এ জন্য বাড়তি জায়গা খোঁজা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কিছু স্থাপনা ভাঙা পড়তে পারে। এ ছাড়া মেট্রোরেলের নির্মাণ ও পরিচালনার ব্যয় বিপুল। এটা বিবেচনায় নিলে বড় অঙ্কের যাত্রী ভাড়া ধরতে হবে। এ জন্য সরকার ভর্তুকি দিয়ে ভাড়া কম রাখার চিন্তা করছে। তবে এখনো ভাড়ার হার ঠিক হয়নি।
মেট্রোরেলে উত্তরা থেকে মতিঝিলে যেতে লাগবে ৩৮ মিনিট। ঘণ্টায় দুই দিক থেকে ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহন করতে পারবে। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৬ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা দিচ্ছে জাপানের আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা জাইকা। বাকিটা সরকার বহন করছে।
এই প্রকল্প ২০১২ সালের ডিসেম্বরে একনেকে অনুমোদিত হয়। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাইকার সঙ্গে ঋণচুক্তি হয়। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪ সাল পর্যন্ত।
উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত স্টেশন হবে ১৬টি। শুরুতে ২৪টি ট্রেন দিয়ে মেট্রোরেল চালু করার কথা রয়েছে। প্রতিটি ট্রেনে প্রাথমিকভাবে ছয়টি করে বগি থাকবে। পরে তা আটটিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা আছে। প্রাথমিক হিসাব অনুসারে, শুরুতে দিনে ৪ লাখ ৮৩ হাজার যাত্রী পরিবহন করতে পারবে। ২০৩৫ সালে যাত্রীসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১৮ লাখের বেশি। এখন চলছে ডিপোর অবকাঠামো নির্মাণকাজ। এই কাজের ঠিকাদার থাইল্যান্ডভিত্তিক        ইতালিয়ান–থাই ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি ও চীনের সিনো হাইড্রো। ২০১৭ সালে শুরু হওয়া এই কাজের অগ্রগতি ৫৭ শতাংশ। প্রকল্প সূত্র বলছে, ডিপো এলাকায় ৫২টি অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে মেট্রোরেলের কোচ ধোয়া-মোছার স্থান, কোচ জোড়া লাগানো বা খোলার জায়গাসহ ১১টি অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। কারখানা, ট্রেন রাখার ছাউনি, ট্রেন পরিচালনার নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, কেন্দ্রীয় স্টোর, প্রশাসনিক ভবন, ডরমিটরি, ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, পয়োনালাসহ বেশ কিছু বড় অবকাঠামোর কাজ চলছে।
উত্তরা থেকে আগারগাঁওয়ের দূরত্ব ১১ দশমিক ৭৪ কিলোমিটার। এই অংশে নয়টি স্টেশন নির্মাণের কাজ চলছে। এর মধ্যে উত্তরায় দুটি স্টেশনের লাউঞ্জ নির্মাণের কাজও চলছে। এই অংশের কাজ শুরু হয়েছে ২০১৭ সালের আগস্টে। ঠিকাদার ইতালিয়ান–থাই ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি। এখন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ৫৯ শতাংশ। এর মধ্যে উত্তরা তৃতীয় পর্ব থেকে মিরপুরের দিকে আট কিলোমিটার উড়ালপথ নির্মাণ শেষ হয়েছে। পৌনে দুই কিলোমিটার পথে রেললাইন বসানোর জন্য ঠিকাদারকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আগারগাঁও থেকে কারওয়ান বাজার অংশের দূরত্ব ৩ দশমিক ২০ কিলোমিটার। এই অংশে তিনটি স্টেশন নির্মাণ করা হবে। গত বছরের আগস্টে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। এই কাজ করছে জাপানের টেক্কেন করপোরেশন, বাংলাদেশের আবদুল মোনেম ও জাপানের এবি নিক্কন কোইগো। এ পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ৩৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ৭০ শতাংশ পাইলের কাজ শেষ হয়েছে। ২০ শতাংশ পাইলের মুখ অর্থাৎ মাটির ওপর ক্যাপ বসেছে। এর ওপর পিলার উঠবে। ইতিমধ্যে একটি পিলার উঠে গেছে।
পিলারের ওপর স্ল্যাব বসানো হবে। এখন পর্যন্ত ২২টি স্ল্যাব নির্মাণ করা হয়েছে। মোট ১ হাজার ৪৮টি স্ল্যাব লাগবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *