“আদর্শ মানুষ চাই”

মোঃ নুরুল আমিন, প্রতিবেদক ইউরো সমাচারঃ স্বভাবগতভাবেই মানুষ আদর্শের প্রতি দুর্বল। কিন্তু আজকাল আদর্শের কথা শুধু মুখে মুখেই শুনা যায়। অনেকে মুখে ভাল ভাল কথা বলে কিন্তু কাজকর্মে বিপরীত। এ যেন সাধু না হয়েও সাধু সাজা। সমাজে আদর্শবান মানুষের খুব অভাব। আদর্শহীনতা আর ছলচাতুরিতে সমাজ ভরে গেছে। সমাজ জুড়ে খারাপ মানুষের সংখ্যা যেমন বেশি, তেমনি তাদের দাপটও বেশি। কথায় আছে, চোরের বড় গলা। আবার কেউ বলে, চোরের সিনা জুড়ি। সমাজে খারাপ মানুষদের ভিড়ে ভাল মানুষেরা টিকে থাকা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে।                                          

অনেক প্রবীণ ব্যক্তিরা কথায় কথায় বলে, অহন আর ভালা মানুষের থাওনের দিন নেই। বেবাক তাউরাসে ভরে গেছে। একজন আদর্শবান মানুষের অনেক মূল্য। কেননা তাকে সবাই ভালোবাসে, সম্মান করে, অনুসরণ করে। পৃথিবীতে যারা মহীয়ান-গরীয়ান হয়েছেন, স্মরণীয়-বরণীয় হয়েছেন, তাদের প্রত্যেকের জীবন মহৎ আদর্শে গড়া। আলোকিত মানুষ হতে হলে মনীষীদের জীবন থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিত। ত্যাগ করার মানসিকতা যার নেই, সে কখনও আলোকিত মানুষ হতে পারে না। যেসব গুণ থাকলে একজন মানুষকে আদর্শবান মানুষ বলা যায়, সেসব গুণের মানুষ পাওয়া দায়।

এখন নীতি-আদর্শের গুণাবলী যেন কথার কথা হয়ে ওঠেছে। বাস্তবে সেসবের রূপায়ণ পাওয়া বড় মুশকিল। কিছু টাকা হারালে তেমন ক্ষতি হয় না, কিন্তু নীতি-আদর্শ হারালে অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যায়। কারণ এতে মানুষের ভেতর থেকে মনুষ্যত্ব হারিয়ে যায়, পশুত্ব মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তখন মানুষের আর হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। তাই প্রতিটি মানুষের উচিত ধৈর্য ও সহনশীলতার সঙ্গে নীতি-আদর্শ ধরে রাখা। একজন আদর্শবান মানুষ পুরো সমাজ তথা দেশকে আলোকিত করতে পারে। দেখা গেছে, ব্যক্তি হিসেবে সৎ কিন্তু একরোখা। এমন মানুষ দিয়ে কিন্তু সবসময় ভাল কিছু আশা করা যায় না। তারা মাঝে মধ্যে হঠাৎ ভাল কিছু করে। ক্ষেত্র বিশেষে এটাও অনেক ভাল। কারণ কথায় আছেঃ হন্দে নেই ঝি, ঘর জামাই দি। ভাল কিছু করতে গেলে অনেক বাধা আসে। তাই ছোট-বড় সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, অন্যের মতকে প্রাধান্য দিতে হবে। মূল্যায়ন করতে হবে। কাউকে অসম্মান করে ভাল কোন কাজ করা অনেক সময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। এমনকি খারাপ মানুষগুলোকে সবসময় ভালো কাজের জন্য উৎসাহ দিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, কোন খারাপ মানুষের ভেতর থেকে যদি একবার তার ভালো দিকটা বের করে আনা যায়, তাহলে তাকে দিয়ে সমাজে অনেক ভাল কাজ করানো সম্ভব।                     

ভালো কাজ করা এবং ভালো কাজের প্রতি আগ্রহ বাড়ানো ভালো মানুষের কাজ। ভোগ-বিলাস, চাওয়া-পাওয়ার ব্যাপকতা, লোভ-লালসা, ধনবাদী চেতনা, স্বার্থপরতা, নৈতিক শিক্ষার অভাব, আত্মকেন্দ্রিকতা, নিজকে বড় মনে করা প্রভৃতি কারণে সমাজ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। সমাজে ভালো মানুষের মূল্য কমে গেছে। যার ফলে মানুষের আদর্শিক চেতনা হারিয়ে যাচ্ছে। সমাজে এখন আদর্শ মানুষ যেন ডুমুরের ফুল হয়ে ওঠেছে। সত্যিকারের আদর্শবান মানুষ নিরিবিলি থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। সহজ সরল পথে চলে। নীতিতে অটল থাকে। স্বাভাবিক জীবন যাপন করে। তারা অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকে। কাউকে ঠকায় না। লোভ-লালসা বা ধান্দাবাজি করে না। তারা কখনও অসৎ পথে চলে না। মিথ্যা কথা বলে না। সততাই আদর্শবানদের মূল লক্ষ্য। বর্তমানে দেখা যায়, যাদের চাপারজোর আছে, যারা ধান্দাবাজি-ঠগবাজি করতে পারে, মিথ্যাচার করতে পারে, প্রতারণার আশ্রয় নিতে পারে, দাপট খাটাতে পারে, অনিয়মকে নিয়ম বলে চালিয়ে দিতে পারে, ধরাকে সরা জ্ঞান করতে পারে তাদের খুব প্রাধান্য। তাই দুঃখজনকভাবে বলতে হয়, সমাজে আজকাল ঠগামদের খুব কদর হয়, সম্মান দেখানো হয়। অথচ সৎ ও নীতিবানদের মূল্যায়ন করা হয় না। আদর্শ জীবন গড়তে হলে আমাদের আদর্শিক চর্চা করতে হবে। এ জন্য নৈতিক শিক্ষা দরকার, আদর্শলিপি পড়া দরকার। আমাদের পাঠ্য বইয়ে আদর্শ ভিত্তিক পড়া থাকা জরুরী। অ-তে অজগর এর বদলে অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করো, ম-তে ময়ূর এর বদলে মিথ্যা বলা মহাপাপ, স-তে সৈনিক এর বদলে সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস ইত্যাদি আদর্শ ভিত্তিক পড়া পড়তে হবে। আমরা যদিও মানুষ, তবুও আমাদের মানুষ হতে হবে। অর্জন করতে মানবীয় গুণ। আমাদের থাকতে হবে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, ভাল আচরণ ও মনুষ্যত্ববোধ। আর এতে আদর্শ মানুষ, আদর্শ প্রজন্ম ও আদর্শ সমাজ প্রাপ্তির আশা করা যায়। প্রতিটি মানুষ হোক আদর্শবান। আদর্শ জাতি গড়ার জন্য আদর্শবাদী মানুষ চাই, আলোকিত মানুষ চাই। সততা ও ন্যায়নিষ্ঠতায় ভরে ওঠুক সমাজ। সত্য ও সুন্দর আলোয় আলোকিত হোক দেশ ও জাতি এটাই প্রত্যাশা।           

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, কবি, নাট্যকার, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক, লালমোহন, ভোলা।

 1,572 total views,  1 views today

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *