চলে গেলেন অমর একুশের গানের রচয়িতা আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

বিশিষ্ট সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সাহিত্যিক আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক প্রকাশ

 নিউজ ডেস্ক থেকে কবির আহমেদঃ আজ বৃহস্পতিবার (১৯ মে) ভোরে লন্ডনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি (ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর।

তার মৃত্যু সংবাদের সাথে সাথেই শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দুপুরে রাষ্ট্রপতির প্রেসসচিব জয়নাল আবেদীন ও প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিমের গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতি এ তথ্য  জানানো হয়।

শোক বার্তায় রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেন,  তার মৃত্যুতে বাংলাদেশ প্রগতিশীল, সৃজনশীল ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একজন অগ্রপথিককে হারালো। তার একুশের অমর সেই গান বাঙালি জাতিকে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তির আন্দোলনে অসীম সাহস ও প্রেরণা যুগিয়েছিল। তিনি একজন বিশিষ্ট কলামিস্ট। লেখনির  মাধ্যমে তিনি আজীবন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে কাজ করে গেছেন। তার মৃত্যু দেশের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। মরহুম আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী  তার কালজয়ী গান ও লেখনির মাধ্যমে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে চির অম্লান হয়ে থাকবেন। রাষ্ট্রপতি মরহুমের মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

এক শোক বার্তায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানের রচয়িতা আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী  তার মেধা-কর্ম ও লেখনিতে এই দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রেখেছেন। তিনি বাঙালির অসাম্প্রদায়িক মননকে ধারণ করে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়কে সমর্থন করে জাতির সামনে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে আমৃত্যু কাজ করে গেছেন।

তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ সরকার নিবন্ধিত সাপ্তাহিক জয় বাংলা পত্রিকায় বিভিন্ন লেখালেখির মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছেন। পরবর্তীতে তিনি প্রবাসে থেকেও তার লেখনীর মাধ্যমে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের কাছে তুলে ধরেছেন।

শেখ হাসিনা আরও বলেন, আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর সঙ্গে আমার বহু স্মৃতি। অনেক পরামর্শ পেয়েছি তার কাছ থেকে। একজন বিজ্ঞ ও পুরোধা ব্যক্তিত্বকে হারালাম যিনি তার লেখা ও গবেষণায় আমাদের বাঙালির ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

এদিকে আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন, অল ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি এম নজরুল ইসলাম, অল ইউরোপিয়ান বাংলা প্রেস ক্লাব(আয়েবাপিসি) এর সভাপতি হাবিবুর রহমান হেলাল, সাধারন সম্পাদক এসকে এমডি জাকির হোসেন সুমন, অল ইউরোপিয়ান বাংলা প্রেস ক্লাব(আয়েবাপিসি) এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও আজীবন সদস্য মনিরুজ্জামান মনির, নির্বাহী সদস্য ও বি ডি নিউজ ২৪ ডট কম এর প্রকাশক এবং সম্পাদক জহিরুল ইসলাম, ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক কবির আহমেদ, অষ্ট্রিয়া আওয়ামী লীগের সভাপতি খন্দকার হাফিজুর রহমান নাসিম, সাধারন সম্পাদক সাইফুল ইসলাম কবির, বাংলাদেশ অষ্ট্রিয়া সিনিয়র ক্লাবের সাধারন সম্পাদক শাহ কামাল, অষ্ট্রিয়া বাংলাদেশ প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও অল ইউরোপিয়ান বাংলা প্রেস ক্লাব(আয়েবাপিসি) এর প্রধান উপদেষ্টা এবং ইউরো সমাচার পত্রিকার সম্পাদক মাহবুবুর রহমান এবং অষ্ট্রিয়া বাংলাদেশ প্রেস ক্লাবের সাধারন সম্পাদক সোহেল চৌধুরী। বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।  

এর আগে তার মৃত্যুর বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক স্বদেশ রায়। এদিকে বিবিসির খবরেও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের খ্যাতিমান সাংবাদিক-লেখক আবদুল গাফফার চৌধুরী বৃহস্পতিবার লন্ডনের একটি হাসপাতালে মারা গেছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন এবং গত বেশ কিছুদিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

লন্ডনে বাংলাদেশ হাই কমিশনের প্রেস মিনিস্টার আশেকুন নবী চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার ভোরে হাসপাতালে তিনি হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। আবদুল গাফফার চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন পারিবারিক বন্ধু এবং লেখকও এই খবর নিশ্চিত করেছেন। মৃত্যুর সময় তিনি তিন মেয়ে এবং এক ছেলে রেখে গেছেন। মাস খানেক আগে তার আরেক মেয়ে দীর্ঘদিন ক্যান্সারে ভুগে মারা যান।

আবদুল গাফফার চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বন্ধু মাসুদুল ইসলাম রুহুল জানান, গত কিছুদিন ধরেই নানা ধরণের শারীরিক অসুস্থতার জন্য বার বার তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হচ্ছিল। ২০১১ সালে স্ত্রী বিয়োগের পর তিনি একাই থাকতেন। শেষের দিকে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের সেবা কর্মীরাই বাড়ি এসে তাঁর দেখা-শোনা করতেন।

১৯৭৪ সালে তিনি অসুস্থ স্ত্রীকে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে নিয়ে আসেন। এরপর বাকী জীবন তিনি লন্ডনেই স্থায়ীভাবে বসবাস করেছেন।আবদুল গাফফার চৌধুরীর সবচেয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনকে নিয়ে লেখা তাঁর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটির জন্য।

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ১৯৩৪ সালের ১২ ডিসেম্বর বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জের উলানিয়ার চৌধুরী বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা হাজী ওয়াহিদ রেজা চৌধুরী ও মা জহুরা খাতুন। ১৯৫০ সালে গাফ্‌ফার চৌধুরী পরিপূর্ণভাবে কর্মজীবন শুরু করেন। এ সময়ে তিনি ‘দৈনিক ইনসাফ’ পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। মহিউদ্দিন আহমদ ও কাজী আফসার উদ্দিন আহমদ তখন ‍‘দৈনিক ইনসাফ’ পরিচালনা করতেন। ১৯৫১ সালে ‘দৈনিক সংবাদ’ প্রকাশ হলে গাফ্‌ফার চৌধুরী সেখানে অনুবাদকের কাজ নেন। এরপর তিনি বহু পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন। 

শিক্ষাজীবন: আবদুল গাফফার চৌধুরী উলানিয়া জুনিয়র মাদরাসায় ক্লাস সিক্স পর্যন্ত লেখাপড়া করে হাইস্কুলে ভর্তি হন। ১৯৫০ সালে ম্যাট্রিক পাস করে ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। ১৯৫৩ সালে তিনি ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৮ সালে বিএ অনার্স পাস করেন। ১৯৪৬ সালে তার পিতার মৃত্যুর পর তাকে চলে আসতে হয় বরিশাল শহরে। ভর্তি হন আসমত আলী খান ইনস্টিটিউটে। সেসময়ে আর্থিক অনটনের শিকার হয়ে উপার্জনের পথ খুঁজতে থাকেন। ১৯৪৭ সালে তিনি কংগ্রেস নেতা দুর্গা মোহন সেন সম্পাদিত ‘কংগ্রেস হিতৈষী’ পত্রিকায় কাজ শুরু করেন। বরিশাল শহরে তিনি কিছুদিন একটি মার্কসবাদী দল আরএসপি’র সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ছাত্র জীবনেই তার সাহিত্য চর্চা শুরু হয়। ১৯৪৯ সালে সওগাত পত্রিকায় তার প্রথম গল্প ছাপা হয়। বরিশালের সন্তান শামসুদ্দীন আবুল কালামের লেখা তখন কলকাতার প্রধান পত্রিকাগুলোতে ছাপা হতো।

তার লিখিত গ্রন্থ সমূহ: চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান (১৯৬০), নাম না জানা ভোর (১৯৬২), নীল যমুনা (১৯৬৪), শেষ রজনীর চাঁদ (১৯৬৭), কৃষ্ণপক্ষ (১৯৫৯) সম্রাটের ছবি (১৯৫৯) সুন্দর হে সুন্দর (১৯৬০) ডানপিটে শওকত (১৯৫৩)।

সম্পাদনা: বাংলাদেশ কথা কয় (১৯৭২), পলাশী থেকে ধানমণ্ডি (২০০৭), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী ভিত্তিক একটি চলচ্চিত্রের কাহিনী, আমরা বাংলাদেশি নাকি বাঙালি। 

সাংবাদিকতার পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস, স্মৃতিকথা, ছোটদের উপন্যাসও লিখেছেন তিনি। ‘চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান’, ‘সম্রাটের ছবি’, ‘ধীরে বহে বুড়িগঙ্গা’, ‘বাঙালি না বাংলাদেশি’সহ তার প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা প্রায় ৩০। এছাড়া তিনি কয়েকটি পূর্ণাঙ্গ নাটক লিখেছেন। এর মধ্যে আছে ‘পলাশী থেকে বাংলাদেশ’, ‘একজন তাহমিনা’ ও ‘রক্তাক্ত আগস্ট’।

পুরস্কার ও সম্মাননা: বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৭), একুশে পদক, ইউনেস্কো পুরস্কার (১৯৬৩), বঙ্গবন্ধু পুরস্কার, সংহতি আজীবন সম্মাননা পদক ২০০৮, লন্ডন, স্বাধীনতা পদক ২০০৯, মানিক মিয়া পদক ২০০৯, যুক্তরাজ্যের ফ্রিডম অব বারা (টাওয়ার হ্যামলেটস) উপাধি, সংহতি আয়োজিত প্রবাসীদের পক্ষ থেকে সংবধর্না ঢাকা ২০০৯।

 16,903 total views,  1 views today