আজ মহান স্বাধীনতা দিবস

নিউজ ডেস্কঃ লাখো শহীদের রক্ত, বহু ত্যাগ ও দু’লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম হানির ফসল এই স্বাধীনতা। স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত মৌলিক অধিকার। সাত সাগর ওপার থেকে আসা ব্রিটিশ বেনিয়া আমাদের স্বাধীনতাকে হরণ করে রেখেছিল ২০০ বছর। বহু ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে অর্জিত হয় স্বাধীনতা।

উপমহাদেশের অঙ্গচ্ছেদ ঘটে। বাঙালি আশায় বুক বাঁধে। কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানে বাঙালির সেই আশা ধুলায় লুণ্ঠিত হয়। ১৯৪৮ সালে যখন তৎকালীন পাকিস্তানি গভর্নর কায়েদে আজম জিন্নাহ ঢাকা এসে বলে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। অথচ পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা ছিল বাংলা। মূলত সেদিনই বাঙালির মৌলিক অধিকারের উপর আঘাত হানে পশ্চিম পাকিস্তানী বেনিয়া শক্তি। পর্যায়ক্রমে বাঙালির উপর বিভিন্ন ক্ষেত্রে অত্যাচার, শাসন আর অবহেলা অসহ্য মাত্রায় বাড়তে থাকে। বাংলা এবং বাঙালির অস্তিত্বকে চিরতরে মুছে ফেলার চেষ্টা করতে থাকে পাকিস্তানি শাসক চক্র। অসন্তোষের দানা বেধে ওঠে বাংলার শহর জনপদ গ্রাম ও প্রতিটি ঘরে ঘরে।                               

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষার বাংলার দাবিতে ছাত্রসমাজ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করে। মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে রফিক, শফিউর, বরকত ও সালাম শহীদ হন। বাংলার প্রাণ প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই সময় জেলে ছিলেন। জেলখানা থেকে ছাত্র মিছিলের উপর গুলিবর্ষণ ও ছাত্র হত্যার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। আন্দোলন ক্রমেই পরিণতির দিকে যেতে থাকে।

১৯৬২ সালে পাকিস্তানি শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ছাত্র সমাজ ব্যাপক আন্দোলন করে। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির সনদ ৬ দফা পেশ করেন। ১৯৬৮ সালের ৩ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে এক নম্বর আসামি করে মোট ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আগরতলা মামলা দায়ের করে পাকিস্তান সরকার। ১৯৬৯ সালের ২২ শে ফেব্রুয়ারি ছাত্র জনতার আন্দোলনের মুখে বাধ্য হয়ে পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধু সহ সবাইকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।                                                   

মূলত ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল পাকিস্তানিদের ভিত কাঁপানো দুর্বার গণ আন্দোলন। বাঙালির ব্যাপক আন্দোলন ও চাপের মুখে ১৯৭০ সালের পাকিস্তান সরকার নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। আওয়ামী লীগ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের ১৬৯ টি আসনের মধ্যে ১৬৭ টি আসন এবং প্রদেশিক পরিষদের ৩০০ টি আসনের মধ্যে ২৮৮ টি আসন লাভ করে। নির্বাচনে বিপুলভাবে জয়ের পরেও পাকিস্তানি সরকার বাঙ্গালীদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বিভিন্ন রকমের ছলচাতুরির আশ্রয় নেয়।                      

৭ ই মার্চ ১৯৭১ সালে রেসকোর্সের বিশাল জনসমুদ্র থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে আহ্বান জানান। বঙ্গবন্ধু ২৫ শে মার্চ রাত ১২ টার ২০ মিনিটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।

বাংলাদেশের জনগণ তোমরা যে যেখানে আছো এবং যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শেষ পর্যন্ত দখলদার সৈন্যবাহিনী কে প্রতিরোধ করার জন্য আমি তোমাদের আহ্বান জানাচ্ছি। পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটি বাংলাদেশের মাটি থেকে বিতাড়িত করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তোমাদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। পাকিস্তানি বাহিনী সেদিন রাতে মধ্যযুগীয় ধ্বংসযজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়ে রাজার বাগ পুলিশ ফাঁড়ি পিলখানা ইপিআরের ঘাঁটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবাস আক্রমণ করে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। রাজার বাগ পুলিশ, ইপিআর জওয়ানরা তাদের সামান্য অস্ত্র নিয়ে পাকিস্তানিদের নগ্ন হামলা জবাব দিতে থাকে।                                           

বঙ্গবন্ধুর এই আহ্বান বেতার যন্ত্র মারফত তাৎক্ষণিকভাবে বিশেষ ব্যবস্থায় সারা দেশে পাঠানো হয়। চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা হান্নান সাহেব সর্বপ্রথম এই ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। এই বার্তা পেয়ে চট্টগ্রাম কুমিল্লা যশোর ময়মনসিংহ সেনানিবাস থেকে বাঙ্গালী জোয়ান ও অফিসাররা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার অপরাধে পাকিস্তান বাহিনী ০১:৩০ মিনিটে বঙ্গবন্ধুকে তার ৩২ নম্বর বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা সেনানিবাসে নিয়ে যায়।                         

২৬ শে মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া এক ভাষণে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং বঙ্গবন্ধুকে দেশদ্রোহী বলে আখ্যায়িত করে। শুরু হয় আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ। দশই এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলার আম্রকানন মুজিবনগরে বাংলাদেশ সরকারের শপথ অনুষ্ঠিত হয়। দশই এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে বিপ্লবী সরকার গঠিত হয়। সতেরোই এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে মুজিবনগর বাংলাদেশ সরকারের শপথ অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দিন আহমেদ প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন এবং সেই সরকারের পরিচালনায় মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৬ ই ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাঙালীর বিজয় অর্জিত হয়। বাংলাদেশ লাভ করে মহান স্বাধীনতা ।  

 3,194 total views,  1 views today

Leave a Reply

Your email address will not be published.