ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দায়িত্ব নিচ্ছেন নতুন মেয়র ফজ‌লে নুর তাপস

 ঢাকা থে‌কে মোঃ সোয়েব মেজবাহউ‌দ্দিনঃ শতকোটি টাকা ঋণের বোঝা নিয়ে দায়িত্বভার গ্রহণ করতে যাচ্ছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নব-নির্বাচিত মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন ঠিকাদার, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ডিএসসিসির কাছে পাবে কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া এই মুহূর্তে কর্মীদের বেতন-ভাতাসহ ঈদুল ফিতরের বোনাস দিতে হিমশিম খাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এরই মধ্যে আগামী ১৭ মে দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত মেয়র তাপস।                                                                                                                                                                          ঢাকা সিটি করপোরেশন দুই ভাগ হওয়ার পর তিনি হচ্ছেন ডিএসসিসির দ্বিতীয় নির্বাচিত মেয়র। জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. আলমগীর বলেন, ‘এই মুহূর্তে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-বোনাস নিয়ে চাপে আছি। এখনো পর্যন্ত (সোমবার) বেতন হয়নি। আশা করছি দুই-এক দিনের মধ্যে বেতন দিতে পারব। আর বোনাস দিতে আরও কয়েক দিন সময় লেগে যাবে। এখন কী পরিমাণ টাকা ঋণে আছে ডিএসসিসি এ প্রশ্নের জবাবে এ কর্মকর্তা বলেন, ‘হিসাব না করে টাকার অংক বলা মুশকিল। তবে বেশ কিছু টাকা আমাদের কাছে পাবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। ডিএসসিসির কর্মকর্তারা জানান, করপোরেশনের বর্তমান বোর্ডের পূর্ণ মেয়াদ শেষ হওয়ার পরই দায়িত্ব নেবেন নতুন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস। ডিএসসিসির চলমান বোর্ডের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ১৬ মে। ২০১৫ সালের ১৬ মে মেয়র সাঈদ খোকনের সভাপতিত্বে প্রথম বোর্ড সভা হয়। এ হিসেবে ডিএসসিসিতে নবনির্বাচিত মেয়র তাপস দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবেন ১৭ মে।                                                   

স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন-২০০৯-এর উপধারা (১)-এর (খ) দফায় বলা আছে, ‘নির্বাচিত মেয়র অথবা কাউন্সিলর করপোরেশনের মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কার্যভার গ্রহণ করিতে পারিবেন না। আর ধারা ৬-এ বলা হয়েছে, ‘করপোরেশনের মেয়াদ উহা গঠিত হইবার পর উহার প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হইবার তারিখ থেকে পাঁচ বৎসর হইবে। ’ এ কারণেই ডিএসসিসি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরও মেয়রের চেয়ারে বসতে কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে ব্যারিস্টার তাপসকে। ডিএসসিসির একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মেয়র হিসেবে তাপসের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ঋণগ্রস্ত করপোরেশনের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া। এই মুহূর্তে ঠিকাদার ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মিলে কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকা পাবে করপোরেশনের কাছে। এ ছাড়া সরকারি যেসব প্রকল্পে ডিএসসিসি অর্থ পেয়েছে সেখানে ম্যাচিং ফান্ডও অনেক বকেয়া রয়েছে। সব মিলিয়ে করপোরেশনের ঋণের পরিমাণ শতকোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ঋণের বিষয়ে করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলেন, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ভাগ হওয়ার ক্ষেত্রে অসম বণ্টন হয়েছে। রাজস্ব আদায়ের দিক দিয়ে সবচেয়ে বেশি এলাকা উত্তর সিটি এলাকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। দক্ষিণ সিটির তুলনায় উত্তরে রাজস্ব আয় প্রায় দ্বিগুণ।                                  

মেয়র হিসেবে সাঈদ খোকন দায়িত্ব নেওয়ার সময়ও এক থেকে দেড়শ কোটি টাকা ঋণগ্রস্ত ছিল করপোরেশন। এ ছাড়া ডিএসসিসির রাজস্ব আদায়েও ধস নেমেছে। বিশেষ করে গৃহকর আর বাজারসালামি থেকে কাক্সিক্ষত রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। গত পাঁচ বছরের বাজেট বই পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আর্থিক সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানটির রাজস্ব আদায় দিন দিন কমছে। বার্ষিক বাজেটে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রার ৩০ শতাংশও অর্জিত হচ্ছে না। গত কয়েক বছরের রাজস্ব বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাজারসালামি খাতে সম্ভাব্য আয় ধরা হয়েছিল ৩০৫ কোটি টাকা, আদায় হয়েছে ৬১ কোটি টাকা। একই অর্থবছরে কর (গৃহ) ধরা হয় ৩৩০ কোটি টাকা, আদায় হয়েছে ২১১ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাজারসালামিতে ৩১৩ কোটি টাকা আয় ধরা হলেও আদায় হয়েছে ৫৩ কোটি টাকা। আর কর (গৃহ) ধরা হয় ৫১৫ কোটি টাকা, যেখানে আদায় হয় ১৮০ কোটি টাকা। এর আগের অর্থবছরে বাজারসালামি খাতে আয় ধরা হয়েছিল ৬৫০ কোটি টাকা, আদায় হয় ১০৫ কোটি টাকা। একই অর্থবছরে কর (গৃহ) খাতে আয় ধরা হয়েছিল ৫০০ কোটি টাকা, আদায় হয় ১৯৫ কোটি টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাজারসালামি থেকে রাজস্ব আয় ধরা হয় ১০০ কোটি টাকা, আদায় হয় ১৫ কোটি টাকা। একই অর্থবছরে কর (গৃহ) খাতে আয় ধরা হয়েছিল ২৮৫ কোটি টাকা, আদায় হয় ১৮০ কোটি টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাজারসালামি থেকে আয় ধরা হয়েছিল ১০০ কোটি টাকা আর আদায় হয় ৫৫ কোটি টাকা। একই অর্থবছরে কর (গৃহ) আয় ধরা হয়েছিল ২৭৫ কোটি টাকা, আদায় হয় ১৭৪ কোটি ২০ লাখ টাকা। আর চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাজারসালামি থেকে আয় ধরা হয়েছে ৩১০ কোটি টাকা।                                          

এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ধারেকাছেও যেতে পারেনি রাজস্ব বিভাগ। সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের অদক্ষতার কারণে রাজস্ব আদায় কার্যত দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন অনেকে। ডিএসসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) মো. ইউসুফ আলী সরদার বলেন, ‘মূলত সিটি করপোরেশন দুই ভাগ হওয়ার পর রাজস্বের দিক দিয়ে ডিএসসিসি ব্যাপকভাবে বঞ্চিত হয়েছে। আবার মার্কেটগুলো থেকেও মামলাসংক্রান্ত জটিলতায় কাক্সিক্ষত রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। গৃহকরের ক্ষেত্রেও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো আদালতের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা এনে রেখেছে। সব মিলিয়ে ডিএসসিসির নিজস্ব অর্থ দিয়ে সব কাজ করা চালিয়ে যাওয়া খুব কষ্টসাধ্য বিষয়।

 4,940 total views,  1 views today