করোনায় আক্রান্ত রোগীর আইসোলেশনে থাকা অবস্থায় করণীয় সম্পর্কে ইউএনও পিযুসের পরামর্শ

 লালমোহন থেকে তপতী সরকারঃ সরকারী দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একের পর এক সরকারী অফিসাররা করোনা আক্রান্ত হচ্ছেন। সম্প্রতি মেহেন্দিগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিযুস চন্র দে ও তার স্ত্রী মুলাদী উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শুভ্রা দাসসহ পরিবারের সাত জন করোনা আক্রান্ত হয়েছেন।

আইসোলেশনে থাকা অবস্থায় তিনি যে সতকর্তা সমুহ মেনে চলেছিলেন তা ইউরো সমাচার পাঠকদের জন্য  হুবহু তুলে ধরা হলোঃ

অনেকেরই জিজ্ঞাসা, করোনা আক্রান্ত হয়ে আমি কি কি চিকিৎসা নিয়েছি? এই কৌতুহল খুব স্বাভাবিক৷ কিন্তু জবাব দেয়াটা বেশ কঠিন; অন্তত আমার পক্ষে। আমরা জানি, করোনা এমন এক রোগ, যার সুনির্দিষ্ট কোন চিকিৎসা বিশ্বের কোথাও নেই৷ এমনকি সুনির্দিষ্ট কোন লক্ষণেও একে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন৷

আমার পরিবারে আমি সহ মোট ৭ (সাত) জন সদস্য প্রায় একই সময়ে করোনা আক্রান্ত হয়েছেন৷ এবং তাদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন লক্ষণ দেখা গেছে৷ কারো শ্বাসকষ্ট, কারো জ্বর, কেউ কেউ বমি করেছেন, কারো আবার পেটের পীড়া। দু’জনের তীব্র মাথাধরা সহ অস্বাভাবিক গা-ব্যাথা ছিল৷ খাবারে অরুচি, ক্ষুধামন্দা, গন্ধ / ঘ্রাণ না পাওয়া এই সমস্যা প্রায় সবারই ছিল৷ ফলে আমার উপর কার্যকর চিকিৎসা, আপনার উপর সমভাবে কার্যকর না ও হতে পারে৷ তাই ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতিত কোনভাবেই ঔষধ সেবনের পরামর্শ আমি দিতে পারি না৷ তবে হ্যা, জীবন যাপনের কিছু সাধারণ অভ্যাস আপনি গড়ে তুলতে পারেন, যা করোনা মোকাবিলায় আপনার পক্ষে খুব ভালো প্রতিরোধক হতে পারে৷

করোনা ভাইরাস থেকে সংক্রমণ রোধে আমাদের করনীয়ঃ

১. ‌কর্মক্ষেত্রে ব্যবহৃত পোশাক বাসায় ফিরে সাবান বা ডিটারজেন্ট দিয়ে ধুয়ে দিন কিংবা পোশাকগুলো একটি ব্যাগে / ঝুড়িতে / রোদে দুই দিন পর্যন্ত রেখে দিন।

২. ‌মানিব্যাগ, বেল্ট, আংটি, ঘড়ি ইত্যাদি এই ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে ব্যবহার করা থেকে যথাসম্ভব বিরত থাকুন৷

৩. ‌টাকা লেনদেনে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে৷ টাকা ধরার পরে হাত অবশ্যই স্যানিটাইজ করে করে নিতে হবে৷

৪. জরুরি প্রয়োজনে বাহিরে যেতে হলে মাস্ক ব্যবহার করুন। মাথায় পাতলা ক্যাপ ব্যাবহার করুন। বাসায় প্রবেশের পূর্বে এগুলো ঢাকনা যুক্ত বিনে ফেলে দিন।

৫. কাপড়ের ক্যাপ ও মাস্ক ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রত্যেকদিন ধুয়ে ব্যাবহার করুন।

এছাড়াও জীবন যাপনের যে অভ্যাসগুলো আমাদের গড়ে তোলা উচিতঃ

১. ‌ভিটামিন-এ, ভিটামিন-সি, ভিটামিন-ডি জাতীয় ঔষধ / খাবার গ্রহণ করুন।

২. ‌প্রচুর পরিমান জল খাবেন।

‌৩. শর্করা জাতীয় খাবার কম খেয়ে লেবু, কমলা, সিজনাল দেশি ফলমূল ও পুষ্টিমানসমৃদ্ধ খাবার বেশী খাবেন।

৪. ‌হালকা গরম পানিতে লবন দিয়ে গড়গড়া করুন- দিনে ৪ বার৷

৫. ‌আদা, লবঙ্গ গোলমরিচ ও মধু দিয়ে হালকা লিকারের র’চা (Raw Tea) পান করুন – দিনে ৪/৬ বার৷

‌৬. আদা, লবঙ্গ গোলমরিচসহ পানি ফুটিয়ে মেনথল দিয়ে ভাপ নিন – দিনে ৪ বার।

৭. ‌নিয়মিত বিরতিতে মধু, লেবুর হালকা গরম পানি পান করুন। (অতিরিক্ত গরম পানি অনেক সময় গলার ক্ষতি করতে পারে। এ বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।)

৮. ‌প্রাণায়াম / ব্রিদিং এক্সারসাইজ করা যেতে পারে। প্রথমে ১ নাক বন্ধ করে অন্য নাক দিয়ে বড় করে শ্বাস নিয়ে অপর নাক দিয়ে ছাড়তে হবে৷ এইভাবে পজিশন পাল্টে দু’নাকেই একনাগাড়ে ১০ বার এবং নিয়মিত বিরতিতে ৪/৫ বার সময় নিয়ে ধীরে ধীরে করতে পারেন৷ এছাড়া নাক দিয়ে বড় করে শ্বাস নিয়ে ৫ সেকেন্ড ধরে রাখা, এরপর মুখ দিয়ে ছাড়া। এভাবে ৫ বার শ্বাস নিয়ে ছেড়ে দিয়ে দুটি কাশি দেয়া। এভাবে দিনে ৪/৫ বার।

৯. ‌ঘরে স্ট্রেচিং / সাধারণ ব্যায়াম করতে পারেন। অধিকক্ষণ শুয়ে / বসে না থেকে নিজের ঘর / বিছানা নিজে পরিস্কার করুন।

১০. নিয়মিত প্রার্থনা করুন ( ধর্মগ্রন্থ পাঠ করুন)।

১১. আইসোলেশনে থাকাকালে আনন্দে থাকার চেষ্টা করুন। অভ্যাস থাকলে বই পড়ুন; ভালো মুভি দেখুন। পছন্দের গান / কবিতা শুনতে পারেন। নিজের পছন্দের গান গাইতে / কবিতা আবৃত্তি করতে পারেন।

১২. এতদসত্ত্বেও কভিড আক্রান্ত হলে ‌সাহস রাখতে হবে; মনে রাখবেন, কোনক্রমেই মনোবল হারানো যাবে না।

বাড়তি সতর্কতা হিসাবে বাসায় যা রাখতে পারেনঃ

১. ‌প্রেসার মাপার যন্ত্র।

২. ‌পালস অক্সিমিটার৷

৩. ‌থার্মোমিটার৷

৪. ‌ইনহেলার নেয়ার জন্য একটি স্পেসার।

হতে পারে, ২০২০ সালে বেঁচে থাকাই আমাদের অন্যতম চ্যালেঞ্জ৷ তাই সর্বোচ্চ সতর্ক থাকুন, সুস্থ থাকুন, বাড়ীতেই থাকুন। আর আপনি সুস্থ থাকলেই ভালো থাকবে আপনার পরিবার এবং দেশ।

 5,125 total views,  1 views today