রাত্রির যাত্রীর পরিচালক, একজন লড়াকু শিল্পীর কত কথা !

সমাচার ডেস্কঃ টেলি কনফারেন্সে হাবিবুল ইসলাম হাবিব এর সাথে সাক্ষাৎকার নেন ইউরো সমাচার সম্পাদক, মাহবুবুর রহমান । তিনি শিল্পী, না তিনি অভিনেতা নন। ক্যানভাসে রং তুলির কুশলী ছোঁয়ায় ছবিও আঁকেননা। তিনি থাকেন নেপথ্যে, নিজের সৃষ্টির আত্মমগ্নতায় নাটকের নির্দেশনা দেন, ছবির পর ছবি সাজিয়ে নির্মাণ করেন একটি গোটা সিনেমা। তিনি হাবিবুল ইসলাম হাবিব। এই সময়ের একজন প্রচার বিমুখ নাট্য নির্মাতা, নির্দেশক, সিনেমার পরিচালক।                                          

শুরুটা সেই নব্বই দশকে। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তখন উত্তাল। শুরুটা নাটক দিয়ে। পুরাতন ঢাকা থেকে উঠে আসা নাটকের নেশায় পরিচিত বন্ধু স্বজনদের নিয়ে গড়ে ফেললেন নাট্য দল ” প্রেক্ষাপট “। তারুন্য তখন রাজপথে। একদল স্বৈরাচার নিপাত যাক শ্লোগানে তারুন্যের শক্তিতে রাজপথ কাঁপাচ্ছে আর এক দল একই প্রত্যয়ে বেইলি রোড মহিলা সমিতি অডিটোরিয়ামে নাটকের পর নাটক নিয়ে আসছে নাগরিকদের সামনে। এই স্রোতে সামিল হন হাবিবুল ইসলাম হাবিবও।                  

প্রেক্ষাপট  নাট্যদল নিয়ে এল ” ইদানীং তিনি ভদ্রলোক ” নাটকটি। নাটকটির রচনা, নির্দেশনায় হাবিবুল ইসলাম হাবিব। নাটকটি দর্শকদের মধ্যে সাড়া ফেলেছিল। এরপর আর একটি স্বৈরাচার বিরোধী নাটক। “ব্যরিকেড চারিদিকে “। তিনি সৃষ্টিতে মগ্ন থাকেননি। অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অকুতোভয় যোদ্ধারুপেও তাকে দেখা গেছে বারবার।

বিটিভি তখন নিজেদের তৈরি অনুস্ঠানই সম্প্রচারিত করতো। দাবী উঠলো বিটিভি বর্হিভুত নির্মাতাদের অনুস্ঠানও প্রচার করতে হবে। সে সময় আকাশ বিনোদেনের আজকের বিস্ফোরনও ঘটেনি। টিভি চ্যানেল বলতে সবেধন নীলমণি একটিই বাংলাদেশ টেলিভিশন “বিটিভি”। এই আন্দোলনেও জরিয়ে গেলেন, সোচ্চার হয়ে উঠলেন আর সবার সাথে। দাবি আদায় হল বিটিভি চালু করলো প্যাকেজ নাটক।                                                         

১৯৯৪ সালে বিটিভিতে তার নাটক ” ভালোবাসা ভালোবাসায়” সম্প্রচারিত হয়। এই নাটকটিও দর্শকদের মনে দাগ কাটে। নব্বইতে স্বৈরাচারের পতন ঘটে। স্বৈরাচার মুক্ত প্রথম বই মেলায় তার মঞ্চে অভিনিত চারটি নাটক নিয়ে বই প্রকাশিত হয়। ” নির্বাচিত নাটক ” নামের এই বইটি বিক্রীর দিকে সে বছর সেরাদের তালিকায় জায়গা করে নেয়। তার মঞ্চের নাটক ” ব্যরিকেড চারিদিকে ” শ্রুতিবদ্ধ করে অডিও ক্যাসেট প্রকাশ দেশের নাট্য আন্দোলনে নুতন মাত্রা যোগ করে। নাটকের আগে ১৯৮৭ সালে ক্যামেরা হাতে তুলে নেন। নির্মাণ করেন মু্ক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক স্বল্পদৈর্ঘ্য ছায়াছবি ” বখাটে “।এই স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবিটি জাতীয় পুরুষ্কারের জন্য মনোনীত হলেও অজানা কারনে ছবিটিকে পুরুষ্কৃত করা হয়নি, বললেন হাবিবুল ইসলাম হাবিব।                         

১৯৯০ এর  গনঅভ্যুথ্থানের পটভুমিতে আর একটি স্বল্পদৈর্ঘ ছায়াছবি ” বিজয় নব্বই ” নামে নির্মাণ করেন।রোকেয়া প্রাচীর অভিনয়ে যাত্রা শুরু এই স্বল্পদৈর্ঘ্য ছায়াছবি দিয়ে। হাবিবুল ইসলাম হাবিবের বিশেষত্ব এই যে, তিনি নতুন নতুন বিষয় নিয়ে কাজ করতে উৎসাহী।দেশে যখন স্যাটেলাইটের কল্যাণে বেসরকারি টিভি চ্যানেলের একটি দুটি করে  আত্মপ্রকাশের শুরু সে সময় থ্রিলার ধর্মী টিভি সিরিয়াল তৈরি করে দর্শকদের চমকে দেন। এটিএন বাংলায় সম্প্রচারিত ” গোয়েন্দা কাহিনী ” বাংলায় নির্মিত প্রথম বাংলা টিভি সিরিয়াল। বড় পর্দায় তার প্রথম নিবেদন ” রাত্রির যাত্রী “।এই ছবিটির মুক্তি দিয়ে তিনি অনুধাবন করলেন মানসম্পন্ন প্রেক্ষাগৃহের আকাল বাংলা সিনেমার অধোগতির বড় একটি কারন। তিনি দাবী তুললেন তিনশত সংসদীয় এলকায় তিনশোটি মাল্টিপ্লেক্স চাই।                       

কেন এই দাবী, এনিয়ে তিনি বলেছেন ” এই বাংলা সিনেমার স্বাধীনতার লাভের দুই দশক পর্যন্ত দর্শক ছিল। এরপরেই পতন শুরু হয়। অগনিত মধ্যবিত্ত দর্শকদের পারিবারিক বিনোদোনের উৎস ছিল সিনেমা দেখা সে থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে লাগলো এই অগনিত দর্শক। এর প্রধান কারন মানসম্পন্ন বাংলা সিনেমা তৈরি না হওয়া। আর বিনোদনের ঘাটতিটা পুরন করলো আকাশ বিনোদন। চারদেয়ালের আবাসে টিভি পর্দায় এসে গেল দেশী বিদেশী নানা শ্রেনীর চ্যানেল। সিনেমা হল গুলো দর্শক শুন্যতায় মাছি তাড়াতে লাগলো। উন্নয়ন তো দুরের কথা বরং একের পর এক সিনেমা হল ভেংগে হতে লাগলো শপিং মল। 

সিনেমা তৈরিতে বড় অংকের অর্থ লগ্নী করতে হয়। সেখানে দর্শকই নেই যাও আবার আগ্রহ সৃষ্টি হতে সিনেমা হলই নেই। যাও আছে তার পরিবেশ বলার মতন নয়। ছাড়পোকার কামড় খেতে কে যাবে গাঁটের পয়সা খরচ করে। অনেকেই বলে থাকেন আকাশ বিনোদনের সংষ্কৃতির এই প্লাবনে সিনেমা হলে দর্শকের ফেরানো কঠিন। তাহলে বিশ্বে এমনকি প্রতিবেশী ভারতে সিনেমার রমরমা হতনা। সেখানে তো আকাশ সংষ্কৃতির বিস্ফোরন ঘটেছে। শত কোটির প্রতিযোগিতা চলছে। আসলে সিনেমা দেখার পরিবেশ সৃষ্টি হলে মানসম্পন্ন সিনেমা তৈরির প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে। সিনেমা দেখার ধরনটাই বদলে গেছে। এখন সিনেমা হলের চাইতে মাল্টিপ্লেক্স সংষ্কৃতির যুগ। সিনেমা দেখা, খাওয়া দাওয়া, শপিং একই ছাদের তলায়। আমাদের এখানে মাল্টিপ্লেক্স থাকলেও সেগুলো সংখ্যায় অনেক কম হলেও সেগুলি মহানগর কেন্দ্রিক। এই মাল্টিপ্লেক্সকে ছড়িয়ে দিতে হবে। অন্ততঃ উপজেলা পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে। এই পরিকল্পনা সরকারের সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব নয়। এজন্যই আমার দাবী তিনশ সংসদীয় আসনে তিনশ সিনেপ্লেক্স চাই। তাহলেই বাংলা সিনেমা বাঁচবে। নির্মিত হবে মানসম্পন্ন সিনেমা। বাংলা সিনেমা ফিরে পাবে তার হারানো গৌরব।                                   

কয়েক বছর ধরেই হাবিব এই দাবি নিয়ে জনমত সৃষ্টিতে কাজ করে যাচ্ছেন অনেকটা একা। তাতে তিনি দমে যাননি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবরে পত্র দিয়েছেন। মিডিয়াও এই দাবির পক্ষে সাড়া দিচ্ছে। লড়াকু হাবিব সবাইকে নিয়ে এই দাবির স্বপক্ষে যেতে চান সাফল্যের দোরগোড়ায়। গ্রুপ থিয়েটার্স ফেডারেশন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, পরিচালক সমিতি, প্রযোজক সমিতি সহ আরো অনেক সংগঠনের সাথে সক্রিয় হাবিবুল ইসলাম হাবিব সেলিনা হোসেনের গল্প নিয়ে পরবর্তী সিনেমার চিত্র নাট্য লিখছেন পাশাপাশি তিনশ সিনেপ্লেক্স এর যে স্বপ্ন তিনি দেখছেন তার বাস্তব রুপ দিতে দিবস রজনী কেটে যায়। লড়াকু হাবিবুল ইসলাম হাবিবকে অভিবাদন, তার লড়াইয়ে আমরা পাশে আছি থাকব।

 6,749 total views,  1 views today