রমজান মাস ও রোজার গুরুত্ব 

 কবির আহমেদ, ভিয়না, অষ্ট্রিয়াঃ রমজান মাস আরবিতে রামাদান (رمضان‎‎) মাস হল ইসলামী বর্ষপঞ্জিকা অনুসারে নবম মাস, যে মাসে বিশ্বব্যাপী মুসলিমগণ রোজা পালন করে থাকেন।রোযা বা রোজা একটি ইরানের ফার্সি শব্দ। আর আরবিতে হল সাউম বা সাওম বা সিয়াম যার অর্থ সংযম।

সিয়াম ইসলাম ধর্মের পাঁচটি মূল ভিত্তির তৃতীয়। সুবহে সাদেক বা ভোরের সূক্ষ আলো থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল প্রকার পানাহার,পাপাচার, কামাচার এবং সেই সাথে যাবতীয় ভোগ-বিলাস থেকেও বিরত থাকার নাম রোজা। ইসলামী বিধান অনুসারে, প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের জন্য রমযান মাসের প্রতি দিন রোজা রাখা ফরজ,যার অর্থ অবশ্য পালনীয়।

রমজান মাস চাঁদ দেখার উপর নির্ভর করে ২৯ অথবা ত্রিশ দিনে হয়ে থাকে যা নির্ভরযোগ্য হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। এ মাসে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম ব্যক্তির উপর সাওম পালন ফরয, কিন্তু অসুস্থ, গর্ভবতী, ডায়বেটিক রোগী, ঋতুবর্তী নারীদের ক্ষেত্রে তা শিথিল করা হয়েছে। কোরআন অবতীর্ণের সূচনার মাস বলে অন্য মাসের তুলনায় এ মাসে ইবাদতের সওয়াব বহুগুণে বাড়িয়ে দেওয়া হয়।

রমজান মাস পবিত্র কোরআন নাযিলের মাস। এ মাসের লাইলাতুল কদর নামক রাতে কোরআন নাযিল হয়েছিল, যে রাতকে আল্লাহতাআলা কোরআনে হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম বলেছেন। এ রাতে ইবাদত করলে হাজার মাসের ইবাদতের থেকেও অধিক সওয়াব পাওয়া যায়। নবী ও রাসূল মোহাম্মদ সাঃ,তাঁহার পরিবারবর্গ এবং সাহাবী রাঃ গণ এই লাইলাতুল কদরের রাতের বিশেষ ইবাদতের জন্য পবিত্র রমজান মাসের দেশ দশ দিন অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে ইবাদত করে কাটাতেন।

পবিত্র কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ কোরআন অবতীর্ণের সূচনার এই রাতে তাঁর সৃষ্টিজগতের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন বলে লাইলাতুল কদরের রাতকে মানুষ সহ সমগ্র সৃষ্টি জগতের ভাগ্য রজনী বলেও আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে।

রমজান মাসের রোজা সম্পর্কে আল্লাহ আল কোরআনে সূরা আল বাকারার ১৮৩ নাম্বার আয়াতে বলেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা পরহেযগারী অর্জন করতে পার।”

তারপর রোজা বা সিয়ামের বিধান সম্পর্কে পরবর্তী অর্থাৎ ১৮৪ নাম্বার আয়াতে বলেন, “গণনার কয়েকটি দিনের জন্য অতঃপর তোমাদের মধ্যে যে, অসুখ থাকবে অথবা সফরে থাকবে, তার পক্ষে অন্য সময়ে সে রোজা পূরণ করে নিতে হবে।আর এটি যাদের জন্য অত্যন্ত কষ্ট দায়ক হয়, তারা এর পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাদ্যদান করবে।যে ব্যক্তি খুশীর সাথে সৎকর্ম করে, তা তার জন্য কল্যাণ কর হয়। আর যদি রোজা রাখ, তবে তোমাদের জন্যে বিশেষ কল্যাণকর, যদি তোমরা তা বুঝতে পার।”

অতঃপর মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহতায়ালা পবিত্র রমজান মাসে পবিত্র আল কোরআন অবতীর্ণের কথা ঘোষণা করে এই মাসের শ্রেষ্টত্বের কথা বর্ণনা করেন। সূরা আল বাকারার ১৮৫ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ বলেন, “রমযান মাসই হল সে মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুষ্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে এ মাসের রোযা রাখবে। আর যে লোক অসুস্থ কিংবা মুসাফির অবস্থায় থাকবে সে অন্য দিনে গণনা পূরণ করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান; তোমাদের জন্য জটিলতা কামনা করেন না যাতে তোমরা গণনা পূরণ কর এবং তোমাদের হেদায়েত দান করার দরুন আল্লাহ তা’আলার মহত্ত্ব বর্ণনা কর, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর।”

রমজান মাসের শেষদিকে শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেলে শাওয়াল মাসের ১ তারিখে মুসলমানগণ ঈদুল-ফিতর পালন করে থাকে যেটি মুসলমানদের দুটি প্রধান ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে অন্যতম একটি।

মহান রাব্বুল আলামিন মানুষকে যে জীবন বিধান দিয়েছেন সেটাই হল ইসলাম। ইসলাম একটি পূর্নাঙ্গ ও প্রগতিশীল জীবন ব্যবস্থা। তাছাড়াও ইসলাম সর্বকালের ও সর্বযুগের জন্য উপযোগী করে প্রণয়ন করেছেন আল্লাহতায়ালা। আল্লাহ প্রত্যেক নবী ও রাসূল গণের উপরেও রোজার বিধান দিয়েছিলেন।তবে একেক সময়ে একেক রকমের বিধান।

ইসলামের ইতিহাস থেকে জানা যায় যে,আমাদের আদি পিতা হযরত আদম (আঃ) এর উম্মতের জন্য প্রত্যেক চন্দ্র মাসের ১৩,১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখা ফরজ ছিল। বনি ইসরাইলের উম্মতের জন্য হযরত মুসা (আঃ) চল্লিশটি রোজা রেখেছিলেন। যার শেষ রোজাটি ছিল আশুরার দিন। হযরত ঈসা (আঃ) পবিত্র ইঞ্জিল কিতাব পাবার চল্লিশ বছর পূর্ব থেকেই রোজা রেখেছিলেন।

পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারার ১৮৫ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন। রমজান এমন একটি মহিমাময় ও গৌরবমন্ডিত মাস যে মাসে কোরআন মজিদ নাজিল হয়েছে। বিশ্বমানবতার সর্বশ্রেষ্ট মুক্তি সনদ সর্বযুগের সর্বদেশের সর্বজাতীর সর্বাঙ্গীন জীবন ব্যবস্থার অপরিবর্তনীয় বিধান গ্রন্থ আল কোরআন যে মাসে নাজিল হয় সে মাসের পবিত্রতা ও পূন্য মহাত্মতা নিঃসন্দেহে অতুলনীয় বিবেচিত হয়।

শুধু কোরআন শরীফই নয়। মুসলমানের বিশ্বাস করে যে পূর্ববর্তী আসমানী কিতাব সহীফা সমূহ ও এই রমজান মাসেই নাজিল করা হয়। রমজান মাসের (১ কিংবা ৩ তারিখে) হযরত ইব্রাহীম (আঃ) সহীফা লাভ করেন। রমজান মাসের ৩ তারিখে হযরত দাউদ (আঃ) নিকট যবুর নাজিল হয় এই মহান মাসের ১৮ তারিখে হযরত ইসা (আঃ) ইঞ্জিল লাভ করেন এই মহিমান্বিত মাসের ১২ তারিখে।

ইসলামের নবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ) দ্ব্যার্থহীন ভাষায় ঘোষনা করেছেন যে (এ পবিত্র মাসে) বেহেস্তের দরজা গুলো উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ থাকে এবং শয়তানকে (তার সহচরদের সহ) শিকল দিয়ে শৃংখলা বদ্ধ করে রাখা হয় (বুখারী ও মুসলীম)।এই থেকেই সহজেই অনুমিত হয় রমজান মাসের গুরুত্ব, পবিত্রতা ও মহাত্মতা কত অপরিসীম ও অতুলনীয়।

রমজান শব্দটি এসেছে ফার্সি রমজ শব্দ থেকে। রমজ শব্দের অর্থ হল জালিয়ে দেয়া, দগ্ধ করা রমজানের রোজা মানুষের মনের কলুষ কালিমা পুড়িয়ে নষ্ট করে দিয়ে মনকে নির্মল ও পবিত্র করে তোলে। পাপ রাশিকে সম্পূর্ন রূপে দগ্ধ করে মানুষেকে করে তোলে পূন্যবান।

কবির আহমেদ, লেখক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট 

 14,595 total views,  1 views today