শৈশবের শবে-বরাত

শাকিল চৌধুরিঃ- শবে-বরাতকে বলা হয় ভাগ্য রজনী। এই রাত্রীতে সাধারণত ভাগ্য নির্ধারণ করা হয়। যার জন্য অনেকেই সারারাত জেগে ইবাদত-বন্দেগী করেন। আবার অনেকেই বলেন ওই রাত্রীতে বিশেষভাবে ইবাদত বন্দেগী করা উচিত না। অনেক মত-অমত রয়েছে শবে-বরাতকে ঘিরে, সেদিকে আমি যাচ্ছি না, আমি চাই আমার শৈশব টা আপনাদের মাঝে তুলে ধরতে কি করতাম শবে-বরাতে, যাতে আপনার শৈশবটা একটু হলেও তাজা করতে পারি।

শৈশবটা একটি গ্রামেই কেটেছে আমার, ঠিক আমার বললে ভুল হবে আমাদের বলা উচিত। তখন শবে-বরাত মানেই ছিলো সারা-রাত জেগে ইবাদত করা। তাই প্রধান কাজই ছিলো ঘুমকে ভাগানো। যে দুপুরে ঘুম পাড়ানোর জন্য মাকে কাঁঠ-খড় পোড়াতে হতো সেই দুপুরের ঘুমটাই যেনো আপন হয়ে যায় শবে বরাতের আগের দিন। ঘুমাতেই হবে কারণ দিনে ঘুমালেই রাত জাগতে পারবো।

ঘুম থেকে উঠেই আসরের নামাজের জন্য মসজিদে যেতাম, এবং সেখানেই সমবয়সী সবাই একত্রিত হতাম, যে যতটাকা পারে চাঁদা তুলতাম শবে-বরাত উপলক্ষে শিন্নি তৈরী করার জন্য। অনেক সময় দেখা যেতো টাকা উঠতো ২০০ কিন্তু ধরকার ৩০০ টাকার, এবং বাকি টাকা কোথায় থেকে আসবে সেটা নিয়ে মহা ঝামেলায় পড়তাম, তবে আমাদের মধ্যে আরিফ ছিলো বড্ড বুদ্ধিমান, ঠিক বুদ্ধিমান না ওর শরীরটা একটু মোটাসোটা ছিলোতো তাই সবাই তাকে বুদ্ধিমান মনে করতাম। সবাই অসহায় হয়ে তার দিকে থাকাতাম? সে কিছুক্ষন চিন্তা করে মোটামুটি একটি ভালো পরামর্শ দিতে পারতো।

এইতো এক শবে-বরাতে এরকমই টাকা ম্যানেজ হচ্ছিল না, সবাই হতাশ কোথা থেকে টাকা আসবে এটা ভেবে, চিন্তা করতে করতে সবাই যখন দিশেহারা, তখন আরিফের মাথায় এক অদ্ভুদ বুদ্ধি আসলো সে বলল “যার যার বাড়িতে প্লাষ্টিক বোতল জমিয়ে রাখছো “চমচম”কিনার জন্য সেগুলা নিয়ে আসো, এগুলাই বিক্রি করে বাকি টাকার জোগাড় হবে। পাঠকদের বলে রাখি তখন ফেলনা জিনিসগুলো জমিয়ে রাখতাম আমরা, এইগুলা কেজি হিসেবে ফেরিওয়ালারা কিনতো, বিনিময়ে টাকা কিংবা চমচম(মিষ্টান্ন জাতীয় খাবার) পাওয়া যেতো।

সবাই একটু অবাকই হলো এতো অল্প সময়ে এতো বড় একটি জোগাড় সাধারণত আমাদের গ্রুপের কেউ করতে পারতো না। সবাই যার যার বাসা থেকে জমিয়ে রাখা প্লাস্টিক বোতল, টিনের টুকরা নিয়ে আসলো, যদিও ফাহিম অর্ধেক নিয়ে এসে বলেছিল আর আমার কাছে নেই। যাইহোক সেইগুলা বিক্রি করে বাকি যে টাকার অমিল রয়েছিলো সেটা পুরণ করেছিলাম।

শিন্নি তৈরী করবার দায়িত্ব সবসময়ই ফাহিমের মায়ের উপর পড়তো কারণ উনি সাধারণত রান্না করতে একটু বেশিই পছন্দ করেন। এবং রান্না বিষয়ে expert ও তিনি।

উনাকে রান্নার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে আমরা মোমবাতি দিয়ে হারিকেন বানাতাম। হারিকেন কেনো বানাতাম সেই বিষয়ে না হয় পরেই বলি।

হারিকেন বানানো শেষে আমরা গোসল করে পরিস্কার জামা কাপড় পড়তাম, এবং মাগরিব শেষে সবাই মিলে আগরবাতি জ্বালিয়ে জিকির করতাম। জিকিরটা সাধারণত এশার নামাযের আগ পর্যন্ত স্থায়ী হতো। কেউ কেউ সুরা তিলাওয়াত করতো কেউবা গজল বলতো।

বারবার জিকির থেকে উঠে ঘরে যেতাম আমি, কারণ ওইদিন ঘরে বিভিন্ন-রকমের সন্দেশ তৈরী হতো। এবং মা লুকিয়ে লুকিয়ে আমাকে খেতে দিতেন, সংখ্যায় কম থাকার কারণে বোনরা যাতে না দেখে তাই লুকিয়ে দিতেন। একমাত্র ছেলে-সন্তান হওয়ায় মা একটু বেশিই ভালবাসতেন।

যথারীতি নিয়মে এশার দশ-মিনিট আগেই জিকির শেষ করতাম। জিকির শেষ হবার পর সবাই লম্বা লাইনে দাঁড়াতো, সবাইকে শিন্নি দেবার শেষে যতটুকু অবশিষ্ট থাকতো তা ঘরে ঘরে বন্ঠন করা হত। এখানে পাঠকদের জানিয়ে রাখা ভালো যে, যত সহজে আপনাদের বলা হলো বন্ঠনের বিষয়টা, ব্যাপারটা অতো সহজ ছিলো না, মাঝে মাঝে হট্টগোল লেগে যেতো, কখনো শিন্নির পরিমাণটা অনেক কম হতো যে, যারা বন্ঠন করছে তারাই ভাগ পেতো না।

আপনাদের কি মনে আছে মোমবাতি দিয়ে হারিকেন তৈরীর কথা বলেছিলাম, হ্যাঁ! ওই হারিকেন জ্বালিয়েই সবাই মসজিদের জন্য রওয়ানা হতাম। দুর থেকে দেখে মনে হতো এক-ঝাঁক জোনাকি পোকা যেনো নেমে এসেছে রাস্তায়। মসজিদে ঢুকার আগে ওইটা নিভিয়ে সেইফ জায়গায় রেখে ঢুকতাম। যদিও মসজিদ থেকে বেরুবার পর বেশির ভাগের হারিকেন মসজিদের পুকুরে ভাসতো। কেন পুকুরে ফেলতো তা আজ অব্দি রহস্যময় রয়ে গেলো।

হুজুর লম্বা ওয়াজ করতেন শবে-বরাতের ফজিলত, এবং ওই রাতে কি করা উচিত এবং কি করা উচিত নয় এটা নিয়ে। আমরা মন দিয়ে শুনতাম, জাবের সবসময়ই ওয়াজ শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যেতো। আমরা থাকে ধরাধরি করে মসজিদের বারান্দায় রেখে আসতাম, ঘুম থেকে উঠে কাউকে না দেখে দৌড়ে এসে মসজিদে ঢুকতো। এবং ওযু করার জন্যে সাথে যাওয়ার অনুরোধ করতো।

নামাজ শেষ করে যার যার ঘরে চলে আসতাম, রাতের খাবার খেতাম, খেয়ে একটু রেস্ট নিয়ে কোরআন তিলাওয়াত, নফল নামায, তাসবীহ পড়তাম। বাবা ও পড়তেন। মা নামায পড়ে আমার মাথায় ফুঁ দিতেন, কেনো দিতেন জানিনা, তবে মায়ের নিশ্বাসটা ভালো লাগতো,ভীতরটা শীতল হয়ে আসতো।

কিছুক্ষন ইবাদত করার পর ক্লান্ত হয়ে গেলে বাড়ির অন্যান্য ঘরে বেড়াতে যেতাম, যদিও ফাহিমদের ঘর ফেবারিট ছিলো কারণ লোকসংখ্যা প্রচুর থাকতো তাদের ঘরে, তাই গল্পের অভাব হতো না।

রাত দু-টা পর্যন্ত সজাগ থেকে কোনো কোনোদিন ঘুমিয়ে পড়তাম, মা ও তুলতেন না, না তুলার কারণ টা আজ অব্দি জানতে পারলাম না।

সকালে উঠে সে কি কান্না, বাবা আদর করে ৫০ টাকার একটি নোট হাতে ধরিয়ে দিতেন আস্তে আস্তে তখন কান্নার আওয়াজটা ও নিচু হয়ে আসতো।

আজ দুর-প্রবাসে বসে আছি, আজ ও হয়তো মা সন্দেশ তৈরী করেছেন, কিন্তু আজ লুকিয়ে লুকিয়ে কেউ খাওয়াতে আসবে না, সেহরি না খেতে পেরে হয়তো আজ কেউ কাঁদবে না, কেউ হয়তো আজ মা কে বলবে না মাথায় ফুঁ দেওয়ার জন্য।

সময় চলে আপন গতিতে, না কখনো কারো জন্য অপেক্ষা করে, না করবে, আমাদের ও চলতে হয় সময়ের সাথে, কিছু হৃদয় ভাঙ্গা স্মৃতি নিয়ে। যা কখনো কাঁদায়, কখনো হাসায় আবার কখনো বা ভাবায়।

 870 total views,  1 views today