বুল বুলি পাখির গল্প এবং করোনার তাণ্ডবে সাড়া বিশ্ব

ঢাকা থেকে খালেদা বাহারঃ ফজরের আজানের ধ্বনি ভেসে আসতেই অরনীর ঘুম ভেংগে গেল।নামাজ আদায় করে বাইরে তাকাতেই দেখতে পেলো এক বুলবুলি দম্পতি বারান্দার রেলিং এর এক কোনায় নিবিড়ভাবে গল্পে মত্ত। অরনীকে দেখেই মাছের লেজের মতো দেখতে লেজগুলো উচিয়ে ফুরুৎ করে উড়ে গেল কোথায় যেন।অরনী ভাবলো, ইশ্ এটা কি করলাম, আমি যদি না আসতাম তা’হলে ওরা হয়তো আরো কিছুক্ষন এরকম আয়েশী গল্পে মেতে থাকতো। ডিস্টার্ব করলাম।মনটা খচ্ খচ্ করে উঠলো।কি আর করা! সেই পশ্চিমদিকের বারান্দার রেলিং ঘেঁষে দাঁড়াতেই অরনীর চোখে পড়লো সামনের রাস্তার পাশের বিশাল বিশাল রেইন ট্রি গুলো আবছা আলোয় ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে।                                  

অরনী একটু নস্টালজিক হয়ে উঠলো , অ-নে-ক বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের এক্সটেনশান বিল্ডিং এর ৭৮ নং রুমের করিডোরে দাঁড়ালেও সামনে দেখা যেতো কলাভবনের সেই সুবিশাল রেইন ট্রি টি ,মনে হতো নীল ক্যানভাসে আঁকা কোন পেইনটিং। গোলাপী ফুলগুলো খুব অস্পস্টভাবে দেখা যাচ্ছে।অবাক ব্যাপার , এই শেষ চৈত্রের প্রচন্ড গরমের দিনেও এত কুয়াসা? সবকিছু আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে যেন কুয়াসার চাদর জড়িয়ে আরামে বুঁদ হয়ে আছে গাছপালাগুলো।সূর্য্যি মামা উঠতে আরো কিছু সময় বাকী।কেমন একটা ঠান্ডা, হিমেল হাওয়া বয়ে গেলো, অরনীর গাঁয়ের লোমগুলো দাঁড়িয়ে গেলো, শীত শীত লাগছে।                                      

বিচিত্র সব পাখীর কিচিরমিচির , কলকাকুলীতো অব্যাহতভাবে চলছেই। বুঝাগেলো জীবিকার খোঁজে বের হবার প্রস্তুতি চলছে।ঘরদোর গুছিয়ে, ছানা থাকলে সেগুলোকে ঠি ক ঠাক করে তবেইতো বেরুতে হবে। কুয়াসার চাদরের অবগুন্ঠন থেকে একটু একটু করে উন্মোচিত হচ্ছে প্রকৃতির অপরুপ রুপ।পাশেই ফুটে থাকা বেলী, আমান্ডা, নয়নতারা আর গন্ধরাজের মন মাতানো মিষ্টি সৌরভ হাওয়ায় ভাসছে। পোর্চটা দখল করে ফেলেছে সাদা আর গোলাপী মাধবী লতা।     

হঠাৎ সাদা ডানা মেলে কয়েকটা বক্ উড়ে গেলো দূর অজানায়।অরনী একটু ভাবনায় পড়লো, কি ব্যাপার সেই কাঁক ডাকা ভোরের কাঁক কোথায়? কা কা তো দূরের কথা, একটা কাঁকওতো দেখা যাচ্ছেনা।তা’হলে কি কাঁকের বিলুপ্তি ঘটতে যাচ্ছে । এমনি করেই কিন্তু সবার জানার অলক্ষ্যে অনেক প্রানী বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিলে, যা অনেক পরে জানা যায়।নাকি এ জায়গায় কোন ময়লা, নোংরা কিছু বা ডাস্টবিন নাই , এজন্য কাঁকদের কোন ইন্টারেস্ট নাই। কে জানে ,হতেও পারে আবার না ও হতে পারে ।

অরনী , এই নির্মল প্রকৃতি দেখবে বলে একটা চেয়ার টেনে বসার আগে মুনিয়া আর হাজেরাকে ডাকলো। উঠে পড়ো তোমরা, সকাল হয়ে গেছে আর বললো হাজেরা আমাকে একটু কালিজিরা আর হলুদ দিও, লেবু , মধুর সাথে।মুনিয়াকে বললো , তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে কায়দাটা নিয়ে বস্। এই ফাঁকেই আরবীটা যতদূর পড়ে নেয়া যায়।অরনী, চারদিক দেখার চেষ্টা করছিলো,কোথায় কি আছে একবার চোখ বুলিয়ে নিতে চাইছিলো কারন গতকাল রাতেই একটি ভাড়া করা মাইক্রো নিয়ে ঢাকা থেকে অরনীরা এসেছে এই অপেক্ষাকৃত নির্জন জনপদের একটি খামার বাড়িতে ।                 

করোনা ভাইরাসের করাল থাবা ছড়িয়ে পড়ায় , আতংকিত হয়ে পড়ছে সবাই।তাই কোলাহলপূর্ন শহর ছেড়ে এই নির্জনবাস।তারপরেও কতটুকু ভালো থাকা যাবে,কি হবে , বাঁচতে পারবে নাকি, এই চিন্তায় মনটা ধক্ করে উঠলো।অস্ফুটে মুখ থেকে বের হলো, হে আল্লাহ সবাইকে ভালো রাখেন।আইসোলেশান, কোয়ারেন্টাইন, লকডাউন এসব দুর্ভেদ্য শব্দগুলো শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা!কি হয়ে গেলো সারা পৃথিবী?ভাবতেই পারছেনা অরনী।ফেব্রুয়ারির ১৩ তারিখে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে গিয়েছিলো কিছুদিন থাকবে বলে কিন্তু অনিবার্য কারণবশত ১৩ দিনের মাথায় ফিরে আসতে হলো ঢাকায়।মাস্ক কিনতে যেয়েতো ভিমরী খাওয়ার জোগার হলো, মাস্ক আউট অফ মার্কেট। ভিতরে ভিতরে এতদূর? এয়ারপোর্টগুলোয় কেমন যেন চাঞ্চল্য লক্ষ্য করা গেলো। চায়নীজ মানুষ দেখলেই সবাই একটু দূরে সরে যাচ্ছিলো এমনভাবে যাতে ওরা বুঝতে না পারে।তখন ঢাকায় মনে হচ্ছিলো, মানুষ শুনেই নাই যে এমন একটা ডেড্লী ভাইরাস চীনের উহান প্রদেশ থেকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে পৃথিবীময়।

হাজেরার ডাকে সম্ভিত ফিরলো- এই ন্যান আফনের হলুদবাটা, কালোজিরাবাটা, লেবু, মধু আর গরমপানি।আফা, তয় নাশ্তা কি বানানু?রুটি আলুর দম্ না রুটি ভাজি?ডিম পোছ, ভাজি না সিদ্ধ?চা না কফি? হাজেরার সাথে কথা শেষ হতে না হতেই মুনিয়া এসে হাজির হলো কায়দা হাতে,মাথায় লাল চুমকীর ঝালড় দেওয়া ওড়না। কারন এখন আরবী পড়ার টাইম।আলিফ যবর আ, বা যবর বা, তা যবর তা, সা যবর সা এভাবে সবগুলো বলে ওঁকে পড়া বুঝিয়ে দিয়ে বললো এগুলো শিখে নে।কিন্তু মুনিয়ার চোখেমুখে সবসময় থাকে হাজারো প্রশ্নের স্তুপ।মা-মী, শুরু করতেই একটু রাগান্বিত ভাব এনে হাতের ইশারায় চলে যেতে বলতেই মুনিয়া বুঝে গেলো , কোন প্রশ্ন এখন করা যাবেনা- মামীর মুড অফ!

অরনী দেখলো চেরীফল গাছে ফুল এসেছে,কাঁঠাল গাছে নতুন মুচি ধরেছে,আমরুজ আর জাম গাছও ফুলে ছেয়ে গেছে। ভ্রমর আর ছোট ছোট পতঙ্গগুলো মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে ফুলে ফুলে।হলুদ, লাল কলাবতী ফুটেছে পুকুরের শান্ত জলের ধারে। ঐ পাড়ে ডোল কলমীর একটি শুকনো ডালে চুপটি মেরে বসে আছে নীলাভসবুজ মাছরাঙ্গা।ফুলহীন শিউলি গাছের হার্ট আকৃতির সবুজ বীচিগুলো শুকিয়ে কালো হয়ে ঝড়ে পড়ার অপেক্ষায় আছে। প্রতিদিনের  নিউজ দেখে গাঁ শিউরে উঠে।                            

ইতিমধ্যে সারা পৃথিবীর প্রায় সবদেশে ছড়িয়ে পড়েছে করোনা ভাইরাস ।এটা এখন আর উহানের এপিডেমিক নয়, সারা বিশ্বের প্যানডেমিক।কি হবে সবার? আত্বিয় পরিজন, সবাই সবাইকে ফোনে ফোনে বলছে , জিনীষপত্র, খাওয়াদাওয়া, ঔষধপত্র যতদূর সম্ভব কিনে রাখো।সামনে দুঃসময় আসছে।কিন্তু কত আর কিনে রাখা সম্ভব? একটা অজানা ভয়ে মনটা আৎকে উঠলো।কিনে রাখা জিনীষ শেষ হওয়ার পরেও যদি এই আকাল থাকে? সবকিছু যদি বন্ধ হয়ে যায়? মানুষ যদি বের হয়ে কেনারাটা করতে না পারে? আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা এতো মজবুত নয়, গরীব দেশ আমাদের,কতদিন টিকে থাকতে পারবে? কি হবে আমাদের? উফ্ আর ভাবতে পারছেনা অরনী।                    

কেমন যেন দম বন্ধ বন্ধ লাগছে।বুকের মধ্যিখানে কেউ হাতুরী পেটাচ্ছে।নাহ্ এসব অলুক্ষনে কথা আর ভাবতে চায়না অরনী।বরং ভালো, পজেচিভ কিছু ভাবা উচিত।গতকাল নিউজে দেখেছিলো, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত ঝাঁকে ঝাঁকে ডলফিনরা খেলায় মেতে উঠেছে।কচ্ছপ কাঁকড়ারা উৎসব করছে নির্জন সমুদ্র সৈকত পেয়ে।ওদের পরিবেশ ওরা ফিরে পেয়েছে যেন।আসলেইতো আমরা মানুষরা কেমন, শুধু নিজেদের কথাই ভেবেছি।কখনো ভাবিনী আমরা ছাড়াও এই গ্রহের আরো বাসিন্দা আছে। এই পৃথিবী তাদেরও পৃথিবী।তাদেরও সাচ্ছন্দে চলার অধিকার আছে এই গ্রহে।                                               

অথচ মানুষরা শুধু স্বর্থপরের মতো নিজেদের কথাই ভেবেছে।নির্বিচার্রে গাছপালা কেটে  পৃথিবীকে উতপ্ত করে ফেলছে, পাহাড় পর্বত উজার করে প্রকৃতির ভারসাম্য শেষ করে দিচ্ছে। কলকারখানা, মিল, অপরিকল্পিত ইটভাটা দিয়ে ওজোন স্তরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে চলছে। কে শোনে কার কথা! এসব চলছে, চলবে!জাতিতে জাতিতে যুদ্ধবিগ্রহ,হানাহানি, হিংসাবিদ্বষ ছড়িয়ে এই অপূর্ব সুন্দর গ্রহটিকে করে তুলছে নরক প্রায়।পৃথিবীর রাক্ষুসে, গোগ্রাসী পুজিবাদী, সাম্রাজ্যবাদী অন্ধপ্রায় নেতাদের অন্তঃসারশূর্ন্য আস্ফালন, নতুন নতুন মারনাস্র, ক্ষেপনাস্র, মিসাইল, পরমানু বোমা, রণতরী, জলতরী সবকিছু আজ ব্যর্থ।

আধুনিকতার নামে পরিবেশ অবান্ধব জিনীষে ভরে উঠছে পৃথিবী। সমুদ্রের তলদেশ নাকি প্লাসটিকে ভরে গেছে।আমরাই আমাদের বাসভূমি পৃথিবীকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছি।কোথায় সেই অরন্য, খালবিল নদীনালা যেখানে ফুটে থাকতো লাল শাপলা আরো কত কি জলজ লতা গুল্ম?কোথায় সেই স্বচ্ছ, পরিচ্ছন্ন, জলরাশির সাগর মহাসাগর যেখানে ঢেউয়ে ঢেউয়ে অবিরাম খেলা করতো তিমি, ডলফিন, হাঙ্গরসহ আরো কত কত জলজ প্রানীর দল? কোথায় সেই সহজ, সরল, অকৃত্রিম , ভালোবাসায় পূর্ন মানুষের মন?

আমরা কি , অসুস্থ বাসভূমী রেখে যাচ্ছি আমাদের প্রানপ্রিয় নতুন প্রজন্মের জন্য? সবকিছু হারিয়ে গেছে মূর্খতার, অপরিনামদর্শীতার আর অজ্ঞানতার অন্ধকারে।তাইতো এই লকডাউনে কোনঠাসা প্রানীরা মেতে উঠেছে আনন্দ উৎসবে।মনুষ্যকুল কাঁদছে আর প্রানীকুল হাঁসছে।হাজেরা এসে বললো , আফা, নাশ্তা লেডি। চিন্তাজগত থেকে যেন ছিটকে পড়লো অরনী, আস্তে করে বললো, যাও ,আমি আসছি।উঠে পড়লো অরনী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *