প্রবাসীদের সাথে মানবিক আচরণ করুন

ঢাকা থেকে, জিল্লুর রহমানঃ বঙ্গ আমার জননী আমার/ ধাত্রী আমার, আমার দেশ/ কেন গো মা তোর শুষ্ক নয়ন?/ কেন গো মা তোর রুক্ষ কেশ?’ বহুকাল আগে কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এই বঙ্গভূমির পীড়া দেখে বিচলিত হয়ে এই প্রশ্ন তুলেছিলেন। সে প্রশ্ন ও এর মীমাংসা আজও হয়নি। আর হয়নি বলেই এই বাংলার সন্তানেরা জন্মভূমির দুঃখ ঘোচাতে ‘পৃথিবীর পথে প্রান্তরে’ বেরিয়ে পড়েছিলেন। জন্মভূমি থেকে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া এই প্রবাসীরা শুধু ব্যক্তিক প্রয়োজনেই বিদেশে পাড়ি জমাননি। তার প্রমাণ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তাঁদের অবদান ও এর চালিকাশক্তি বৈদেশিক মূদ্রার প্রবাহ এবং এর শক্তিশালী রিজার্ভ। এ সব প্রবাসীরা বিদেশে আমাদের প্রতিনিধি ও রেমিট্যান্স যোদ্ধা।

করোনা ভাইরাসের প্রভাবে সারাবিশ্ব থমকে দাড়িয়েছে। লকডাউনের কারণে মানুষের জীবন যাত্রা স্থবির, কর্মপ্রবাহ নিশ্চল, আয় রোজগার বন্ধ এবং পৃথিবীর সব দেশের অর্থনীতির চাকা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে সকলে ভীতসন্ত্রস্ত, দিক বিদিক ছুটছে এবং অনেকে এ সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রাণ রক্ষার্থে নিজ জন্মভূমির টানে দেশে চলে এসেছে। কিন্তু দেশে এসে তারা গৃহবন্দী হয়ে পড়েছে এবং অনেকে তাদের সাথে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলছে। প্রিয়জন কিংবা নিকট প্রতিবেশীরাও তাদের সাথে এমন রুঢ় আচরণ করছে যেন তারা কোন অচ্ছুৎ শ্রেণীর লোক বা প্রাণী। অথচ এমনটা হওয়ার কথা নয়।

স্বাধীনতার পরপরেই বাংলাদেশের মানুষ জীবিকা নির্বাহের তাগিদে প্রবাসে যেতে শুরু করেছিল, বিশেষ করে ১৯৭৬ এর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। কারণ সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশের পক্ষে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান করা সম্ভব ছিল না। ৮০’র দশকের শেষ ভাগে এসে এর পালে গতি পেল অর্থাৎ বিপুল পরিমাণে মানুষ বিদেশ যেতে আরম্ভ করলো। বিগত চল্লিশ বছরে যা এখন প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষের ঘরে পৌছেছে এবং প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া, ১৯৬০ সালে যুক্তরাজ্য যখন বাংলাদেশিদের জন্য তাদের দুয়ার খুলে দেয়, তখন থেকে বাংলাদেশি প্রবাসীরা আর থেমে থাকেননি। সারা বিশ্বে তারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন আর প্রতিনিয়ত দেশের জন্য হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।

প্রবাস জীবন মানেই নিঃসঙ্গতা। তবু দেশ ও দেশের মানুষকে বুকে পুষে এই নিঃসঙ্গতা মেনে নিয়ে প্রবাসীরা করে যান কঠোর পরিশ্রম। কত ধরনের ত্যাগ স্বীকার করতে হয় তাঁদের। অথচ বিদেশে বাংলাদেশের রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক থেকে শুরু করে, বাংলাদেশি দূতাবাস, বাংলাদেশে বিমানবন্দর পর্যন্ত প্রবাসীরা নানা বিড়ম্বনার মুখে পড়েন। অথচ বাংলাদেশ, এর সমাজ ও অর্থনীতিতে অবদানের বিপরীতে এটা কখনোই তাঁদের প্রাপ্য হতে পারে না। অবশ্য বাংলাদেশ সরকার প্রবাসীদের কল্যাণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে; কিন্তু তা যথেষ্ট নয়।

উন্নত জীবনের আশায়, উচ্চশিক্ষার টানে কিংবা অন্য যে কারণেই বাংলাদেশের মানুষ বিদেশে যাক না কেন, তাঁদের মন পড়ে থাকে এই জল হাওয়াতেই। আর এ কারণেই এখানে রেখে যাওয়া স্বজনদের, এখানকার মাটিকে তাঁরা কখনো ভুলতে পারেন না। নিজেদের কষ্টার্জিত উপার্জনের অর্থ নিয়মিত পাঠিয়ে তাঁরা এ দেশকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষে গড়ে তোলেন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১৪৯৮ কোটি ডলার,  ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১৬৪২ কোটি ডলার এবং চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারী ২০২০ পর্যন্ত ১২৫০ কোটি মার্কিন ডলার প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে পাঠিয়েছেন। এই রেমিট্যান্সের অবদান মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১২ শতাংশ। তৈরী পোশাকের পরে অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান সবচেয়ে বেশী অর্থাৎ দ্বিতীয় স্থান যা দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে রাখতে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। প্রবাসীদের কারণে এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ রেকর্ড পরিমানে আছে এবং যার পরিমান ফেব্রুয়ারী ২০২০ পর্যন্ত  প্রায় ৩২৯৮ কোটি মার্কিন ডলার। এই অবদান এতটাই শক্তিশালী ও গুরুত্বপূর্ণ যে, ২০০৮ সালে আমেরিকায় শুরু হওয়া অর্থনৈতিক মন্দা যখন পুরো বিশ্বকে চোখ রাঙিয়েছে, তখন বাংলাদেশের জন্য বর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল এসব প্রবাসীরা। বাঁচিয়েছিল এ দেশের মানুষ ও এর অর্থনীতির চাকাকে।

শুধু অর্থের বিচারেই প্রবাসীদের অবদান বোঝা সম্ভব নয়। বর্তমানে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা এক কোটি বিশ লক্ষ বাংলাদেশি বেকারত্বের সংকট মোকাবিলাতেও সরাসরি অবদান রাখছেন। এছাড়া তাঁদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণমূলক সংগঠন। অথচ এই সবকিছুর পরও এই প্রবাসীদের নানা অবজ্ঞার মুখে পড়তে হয়। নিজ দেশে স্বজনদের কাছে যখন তাঁরা ফিরে আসেন, তখন থেকেই তাঁদের মুখোমুখি হতে হয় নানা হেনস্তার।

এদেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ পেটের দায়ে বাধ্য হয়ে নিজ উদ্যাগে পাড়ি দিয়েছেন বিশ্বের নানান প্রান্তে। আর পরিবার পরিজনের মায়া ত্যাগ করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তৈরি করে যাচ্ছে নিজের ও দেশের বর্ণিল সোনালী ভবিষ্যৎ। কিন্তু এসব মানুষের অনেকের খুব তিক্ত অভিজ্ঞতা সম্মুখীন হতে হয় বিদেশ পাড়ি দেওয়ার সময়। দেশী বিদেশী দালাল ও প্রতারকের কারণে অনেকে তাদের সহায় সম্বল হারিয়ে পথে বসে। তারপরেও তারা ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখে এবং সংগ্রাম চালিয়ে যায় সোনালী আগামীর আশায়। আর এভাবে দাঁড়িয়ে যায় একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি।

প্রবাসীরা কোনো প্রতিদানের আশায় দেশের অর্থনীতি ও সমাজে অবদান রাখেন না। তাঁরা এই অবদান রাখেন দেশের প্রতি মমত্ববোধ ও দায়িত্বশীলতা থেকে। তাঁরা এদেশেরই সন্তান এবং শুধু চান বাংলাদেশ তাঁদের আপন বলে জানুক। বাংলাদেশের মানুষ তাঁদের বুকে টেনে নিক। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে প্রতিনিয়ত চলমান রাখা এই প্রবাসী জনগোষ্ঠী শুধু চায় প্রতিদান না হোক, অবজ্ঞা যেন না করা হয়।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ন্যায় আমাদের দেশেও করোনা সংক্রমণ ধীরে ধীরে বাড়ছে। কিন্তু যেসকল মানুষ এত কষ্ট করে দেশকে সামনে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে, তাদের প্রতি এ মহাদূর্যোগে আমরা যে রুক্ষ আচরণ করছি তা একদিকে যেমন অনভিপ্রেত, তেমনি দুঃখজনকও বটে। অনেক প্রবাসী অধ্যূষিত স্থানে মাইকিং করে তাদেরকে বয়কট করতে বলা হচ্ছে, তাদেরকে একঘরে করে দেওয়া হচ্ছে, তাদের পরিবারের সাথে সামাজিক বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে, নানাভাবে হয়রানী ও হেনস্তা করা হচ্ছে, এগুলো একদিকে যেমন এক ধরণের জঘন্য অপরাধ, ঠিক তেমনি চরম বাড়াবাড়ি। প্রাণ বাঁচাতে, প্রাণের তাগিদে তারা তাদের নিজ জন্মভূমিতে ছুটে এসেছে, এটা কোন অপরাধ নয়, বরং আমরা যা করছি, সেটা অন্যায়, অমানবিক। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ হলে তারা হয়তো আবার তাদের কর্মস্থলে ফিরে যাবে। তারা আবার আমাদের দেশের চাকা সচল রাখতে সহায়তা করবে। তাদের এ দুর্দিনে তাদের পাশে দাড়িয়ে সহমর্মিতা জানানো, সাহস ও শক্তি যোগানো আমাদের মানবিক ও সামাজিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। কেউ সুনির্দিষ্টভাবে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে অবশ্যই সতর্কতা বজায় রেখে চলবো কিন্তু অযথা তাদের হয়রানী করা যাবে না। তারা আমাদের ভাই বোন, প্রতিবেশী, এদেশেরই সন্তান।আসুন আমরা প্রবাসীদের প্রতি সদয় ও মানবিক হই এবং তাদের পাশে দাঁড়াই।

বিনীতভাবে

মো. জিল্লুর রহমান
ব্যাংকার ও লেখক,
সতিশ সরকার রোড,
গেণ্ডারিয়া, ঢাকা
zrbbbp@gmail.com

 5,428 total views,  1 views today