ফেইসবুক ও অম্ল-মধুর কিছু কথা…


সাব্বির আলম বাবু ,নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
 মজার ছলে  খোলা আমার ফেইসবুক আইডিতে প্রতিদিনের অভ্যাস মত কছু সময়ের জন্য ঢুকে নোটিফিকেশন, সংবাদ ইত্যাদি চেক করছিলাম। হঠাৎ ঐ অবস্থাতেই একটি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এলো। সেখানে প্রোফাইল পিকচারে একটি ফুলপর ছবি সেট করা। ফেক আইডি মনে করে ডিলিট করতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম ফেইসবুক আইডিটির নাম কামরুল হাসান মিলন। প্রোফাইলে ঢুকে চেক করে দেখলাম আমার বাল্যবন্ধু মিলন। দীর্ঘ ১৪ বছর পর বন্ধু মিলনের কৈশোর উত্তীর্ন চেহারাটা মনের গহীনে ভেসে উঠলো। পুরনো স্মৃতি উঁকি দিলো। নস্টালজিয়াতে মজে গেলাম। এক এলাকাতেই আমাদের বাড়ী।

১৯৯৮ সালের এসএসসি ব্যাচের ছাত্র ছিলাম আমরা। পরীক্ষার আগ পর্যন্ত কত দুস্টোমি, আনন্দ, মজার স্মৃতি ছিল আমাদের। ক্লাসমেট বন্ধু-বান্ধুবীরা ছিলাম এক অন্তঃ প্রান, এক পরিবারের সদস্যের মতো। একজনের বিপদে, ভালো-মন্দে অপরজনেরা দলবেধে এগিয়ে আসতাম। বহিরাগত অন্য কেউ আমাদের সাথে অন্যায় আচরন করলে দলবেধে প্রতিবাদ করতাম। পড়ালেখাতে প্রতিনিয়তই চলতো ক্লাসে এক/দুই নম্বর রোল হওয়ার প্রতিযোগীতা। ছোটবেলা থেকেই আমার বইপড়া লেখালেখির অভ্যাস। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি মাসুদরানা, কুয়াশা, ঠাকুরমার ঝুলি পরবর্তীতে হুমায়ুন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, সুকুমার রায়, মীর মোশারফ হোসেন, শেক্সপীয়র, শীর্ষেন্দু, সুনীল ইত্যাদি লেখকের বেশ কিছু বই পড়া শেষ। এই নেশাটা পরে ধর্মীয় বইয়ের দিকে ধাবিত হয়। সে জন্য অবশ্য বাবার অবদানও কম নয়। আমার যত্নে গড়া ছোটখাটো একটা বুক শেল্ফ ছিল।                                         

সে যাই হোক এই নেশাটা আমার একটা সহজাত দক্ষতা তৈরী করেছিল যে, যেকোন বিষয়ের উপর তাৎক্ষনিক রচনা তৈরী করা। এই দক্ষতা ভবিষ্যতে আমার কর্মজীবনে ও লেখালেখিতে ভীষন সহায়তা করেছিল। পাশাপাশি সেটা চিঠি লেখা, পত্রমিতালী, আপনমনে গল্প, কবিতা করা যা এক সময়ে দেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশের পাশাপাশি পাশ্ববর্তী ভারতেও ছড়িয়ে পড়ে। নতুন নতুন বন্ধুর সৃস্টি হয়। বেশীর ভাগই লেখক, সাংবাদিক আর কবি বন্ধু। কেউ এখনও জাগ্রত আবার কেউ নিদ্রিত। তখনও মোবাইল বা স্মার্ট মোবাইলের ব্যবহার বর্তমানের মতো ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়েনি। ডাকঘর আর আমার যোগাযোগ ছিল অফুরন্ত। সরকারী বন্ধ ছাড়া এমন কোন দিন নেই যে আমি ডাকঘরের আঙ্গীনায় পা রাখিনি। কোন সমস্যা বা প্রাকৃতিক দূর্যোগ ও সেই সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। তো আমার এই রচনা লেখার দক্ষতার বিষয়টা নিয়ে স্কুল জীবনের বাল্যবন্ধুরা বেশ হিংসা করতো। সেই দলে মিলন ছিল অগ্রভাগে। আমি এটা বেশ উপভোগ করতাম। শিক্ষকদের আলাদা স্নেহ পেতাম। বন্ধুরা যতই হিংসা করতো ততই আমি তাদের ভালোবাসতাম।                     

এবার আসি ফেইসবুক প্রসঙ্গে। আমার মতে ফেইসবুক হচ্ছে পত্রমিতালীর আধুনিক সংস্করন। বন্ধু মিলনের মতো পুরনো অনেক বাল্যবন্ধুই এসএসসি পরীক্ষার পর ব্যক্তিগত নানা কারনে স্থান ত্যাগ করে ফলে তাদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফেইসবুকের মাধ্যমে মিলনের মতো একে একে পরনো অনেক বন্ধুকেই নতুন করে আবার ফিরে পেতে থাকি। তাদের সাথে কথা হয় কদাচিৎ দেখা হয়। এরই মাঝে ঘটে একটি বিষাদময় ঘটনা। ফেইসবুকেই একদিন জানতে পারলাম মিলনের লিভার সমস্যা জরুরী অপারেশন করাতে হবে রক্তের প্রয়োজন। অনেক বন্ধুই রক্ত দিতে সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু রোগটি ক্যান্সারে রুপ নিয়েছিল বিধায় তাকে আর বাঁচানো যায়নি। তার হৃদয় বিদারক মৃত্যু এবং ঢাকা থেকে দেশের বাড়ী এনে দাফন করা সব খবরাখবরই আমরা ফেইসবুকের মাধ্যমে পেয়েছি। এক পর্যায়ে এই আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমেই আমরা সকল বন্ধু এক হতে পেরে মিলনের শেষকৃত্যের যাবতীয় কাজ তার পরিবার সহ সম্পন্ন করতে পেরেছিলাম।                                           

এখন অনলাইন নির্ভর অফিসিয়াল কাজ, বিজ্ঞাপন, চ্যাট, মেসন্জার, অডিও, ভিডিও, লাইভ, কেনাকাটা, পত্রিকার কাজ, বিনোদন ইত্যাদি সবই ফেইসবুক ও ইন্টানেটের কল্যানে ঘরে বসেই করা যাচ্ছে। তবে আক্ষেপের বিষয় এই ফেইসবুক- ইন্টারনেট এতো ভালো সেবা আমাদের দিচ্ছে তার সঙ্গে দেশের তরুনদের ক্রমশ অলস করছে। তরুনরা এখন খেলাধুলা, সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা রেখে ফেইসবুক আসক্তিতে নিমোজ্জিত হচ্ছে। অনৈতিক কর্মকান্ডে পা বাড়াচ্ছে। সেই সাথে ফেক আইডি, অশ্লিল লেখা ও ছবি পোস্ট করা, উগ্রবাদী ধর্মীয় ও দেশদ্রোহী কিছু চক্র ফেইসবুক ব্যবহার করে তরুনদের বিভ্রান্ত করছে। এসব কারনে এই প্রযুক্তির ভালো অর্জন গুলো ম্লান হচ্ছে। তাই আমাদের সকলেরই ফেইসবুকের ভালোটা গ্রহন করে মন্দটা পরিহার করা উচিত।

 4,850 total views,  1 views today