অস্ট্রিয়ায় কিছু শিথিলতাসহ লকডাউন ৬ জানুয়ারী পর্যন্ত বর্ধিত

 অন লাইন ডেস্ক থেকে,কবির আহমেদঃ অস্ট্রিয়ায় চলমান লকডাউনটি আগামী ৬ জানুয়ারী পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। দ্বিতীয় এই লকডাউনটি ১৭ নভেম্বর থেকে ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঘোষণা করা হয়েছিল।

আজ ২ ডিসেম্বর বুধবার সকালে অস্ট্রিয়ার সরকার প্রধান চ্যান্সেলর (প্রধানমন্ত্রী) সেবাস্তিয়ান কুর্জ এবং উপ প্রধান ভাইস-চ্যান্সেলর(উপ প্রধানমন্ত্রী) ভার্নার কোগলার অস্ট্রিয়ার ফেডারেল রাস্টপতি আলেকজান্ডার ভ্যান(ফান) ডের বেলেনের সাথে সাক্ষাৎকার করেন। তারা রাস্ট্রপতিকে করোনার লকডাউন ৬ জানুয়ারী পর্যন্ত বর্ধিত করেন ও কিছু শিথিলতা সম্পর্কে অবহিত করেন।

ফেডারেল রাষ্ট্রপতি আলেকজান্ডার ভ্যান ডার বেলেন তাদের সাথে বৈঠক শেষে এপিএ কে বলেন, “আগের চেয়ে শক্তিশালী হওয়ার জন্য সঙ্কট থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আমাদের সমাজের সকল প্রাসঙ্গিক শক্তির মধ্যে ভাল সহযোগিতা প্রয়োজন।” “অতীতের মতো আগামী সপ্তাহ এবং মাসে আমাদের দেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে।” পরের কয়েক সপ্তাহ অবশ্যই “স্বাস্থ্য সঙ্কট নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং তৃতীয় তরঙ্গ প্রতিরোধের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা” আমাদের সকলের সম্মিলিত চেষ্টার বিকল্প নাই। তিনি সকলকে করোনার গণ পরীক্ষায় অংশগ্রহণেরও অনুরোধ করেন।

পরবর্তীতে বিকালে সরকার প্রধান চ্যান্সেলর সেবাস্তিয়ান কুর্জের নেতৃত্বে মন্ত্রিপরিষদের বিশেষ বৈঠকের পর এক সাংবাদিক সম্মেলনে সেবাস্তিয়ান কুর্জ কিছুটা শিথিলতার সাথে লকডাউন ৬ জানুয়ারী পর্যন্ত বর্ধিত করার ঘোষণা দেন। বৈঠকে উপ প্রধান ভার্নার কোগলার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কার্ল নেহামার এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী রুডল্ফ আনস্কোবার উপস্থিত ছিলেন। 

সংবাদ সম্মেলনে লকডাউনে যে সমস্ত বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে সেগুলো নিম্নরুপঃ                                      

সোমবার ৭ ডিসেম্বর থেকে  অস্ট্রিয়ায়  পুনরায় দোকানপাট ও ব্যবসা-বাণিজ্য খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে মাস্ক ও সামাজিক দূরত্ব যথাযথ মেনে চলার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তাছাড়াও বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেমন কিন্ডারগার্টেন ও প্রাইমারী স্কুল (Volksschule) খোলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এখানেও শিক্ষামন্ত্রণালয়কে যথাযথ বিধিনিষেধ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তবে উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,হাই স্কুল এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে Distance Learning অর্থাৎ অনলাইন ক্লাশ অব্যাহত থাকবে। প্রাইমারী স্কুলে ১০ বৎসরের উপরে শিক্ষার্থীদের ক্লাশ রুমে মাস্ক পড়তে হবে। বাহিরে বের হওয়ার নিষেধাজ্ঞা (কারফিউ) আগামী ৭ ডিসেম্বর থেকে ৬ জানুয়ারী পর্যন্ত রাত ৮ টা থেকে ভোর ৬ টা পর্যন্ত করা হয়েছে। ক্রিসমাসের সন্ধ্যা এবং নববর্ষের প্রাক্কালে কিছুটা ব্যতিক্রম রয়েছে, যেমন তখন দশ ব্যক্তির সাথে দেখা হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সোমবার থেকে যাদুঘর এবং গ্রন্থাগারগুলি (লাইব্রেরী) খোলার অনুমতি দেয়া হয়েছে।এখানেও মাস্ক ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। তবে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলি এখনও নিষিদ্ধ এবং সিনেমাগুলি বন্ধ থাকবে। ইন্ডোর খেলাধুলারও অনুমতি নেই, ফিটনেস স্টুডিওগুলিতেও প্রবেশ করা যাবে না।

আগামী ২৪ শে ডিসেম্বর থেকে স্কিইং বা আইস স্কেটিংয়ের মতো স্বতন্ত্র বহিরাঙ্গন ক্রীড়াগুলির অনুমতি দেওয়া হবে। ক্রিসমাস ও নববর্ষ ব্যতীত বর্তমানে লকডাউন দুইটি পরিবার একসাথে মিলিত হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ক্রিসমাস ও নববর্ষের সময় ১০ জনের অনুমতি দেয়া হয়েছে। হেয়ারড্রেসার(সেলুন) বা ম্যাসেজ থেরাপির মতো দেহের নিকটবর্তী ব্যক্তিদের সহ – বাণিজ্য এবং পরিষেবাগুলিকে সোমবার থেকে পুনরায় খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

অবশ্য গতকাল সংবাদ মাধ্যমে সেলুন অব্যাহত বন্ধ থাকার কথা বলা হয়েছিল। তবে এইসব প্রতিষ্ঠানে প্রতি দশ বর্গমিটারে একজন গ্রাহকের সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছে। এখানেও মাস্ক বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। রেস্তোঁরা এবং আবাসিক হোটেলগুলি অবশ্যই ৬ জানুয়ারী পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। এই বৎসর ক্রিসমাসের বিশেষ বাজারগুলি অনুমোদিত নয় এবং নতুনভাবে Punschstände(ডিসেম্বর মাসে একধরনের গরম অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়ের স্ট্যান্ড) আগামী ৭ ডিসেম্বর থেকে ৬ জানুয়ারী পর্যন্ত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ভ্রমণে বিশেষ কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ের পর থেকে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল থেকে যে কেউ অস্ট্রিয়ায় প্রবেশ করবে তাকে অবশ্যই বাধ্যতামূলক ১৪ দিনের কোয়ারান্টাইনে থাকতে হবে। তবে বর্তমানে ইইউ দেশ সমূহের মধ্যে নেগেটিভ সনদ নিয়ে চলাচলের অনুমতি রয়েছে।                                

চ্যান্সেলর সেবাস্তিয়ান কুর্জ লকডাউন সফল হয়েছে বলে সন্তোষ প্রকাশ করে জানান,প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে থাকা এই শক্ত লকডাউন কার্যকর হয়েছে। করোনার সংক্রমণের বিস্তার ধীরে ধীরে কমে আসছে। আমাদের হাসপাতাল ও আইসিইউ কেন্দ্র যে হুমকির মুখে পড়েছিল তা পুনরায় তার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসছে। তিনি আবারও সতর্ক করে বলেন, “মহামারীটি এখনও শেষ হয়নি।” তিনি আশঙ্কা করছেন ক্রিসমাস এবং নববর্ষের আগের দিকে আবার সংক্রমণের সংখ্যা কিছুটা বাড়তে পারে।                     

সরকারের উপ প্রধান ভার্নার কোগলার বলেন,রেস্তোঁরা ও আবাসিক হোটেল সমূহ বন্ধের জন্য ক্ষতিপূরণ অর্থাৎ সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মাননীয় অর্থমন্ত্রী এ সম্পর্কে পরে বিস্তারিত জানাবেন। তবে বর্তমানের মতোই অনলাইন রেস্টুরেন্ট এবং বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট ও ফাস্ট ফুডের দোকান থেকে খাবার সংগ্রহের নিয়ম অব্যাহত থাকবে। তিনি আরও বলেন,করোনার সংক্রমণের বিস্তার “দ্রুত পর্যাপ্তভাবে ঘটছে ” সুতরাং,জানুয়ারী পর্যন্ত ক্রিসমাসের অনুষ্ঠানের কোনও অনুমতি দেয়া যাচ্ছে না। তবে আমরা পরিস্থিতির উপর ভিত্তিকরে আগামী দুই সপ্তাহ পর নতুন সিদ্ধান্ত নিতে পারি।      

এদিকে আজ অস্ট্রিয়ায় নতুন করে করোনায় সংক্রমিত সনাক্ত হয়েছেন ৩,৯৭২ জন এবং মৃত্যুবরণ করেছেন ১২১ জন। রাজধানী ভিয়েনায় আজ আক্রান্ত সনাক্ত হয়েছেন ৫৫৩ জন। অন্যান্য রাজ্যের মধ্যে Oberösterreich রাজ্যে ৬৭৭ জন,NÖ রাজ্যে ৬৩৬ জন, Steiermark রাজ্যে ৫৯৩ জন,Salzburg রাজ্যে ৪৫০ জন,Kärnten রাজ্যে ৩৫৮ জন,Tirol রাজ্যে ৩৩২ জন,Vorarlberg রাজ্যে ২২২ জন এবং Burgenland রাজ্যে ১৫১ জন নতুন করে সংক্রমিত সনাক্ত হয়েছেন।                                         

অস্ট্রিয়ায় এই পর্যন্ত করোনায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২,৮৯,৪৬১ জন এবং মৃত্যুবরণ করেছেন ৩,৪৪৬ জন। করোনা থেকে এই পর্যন্ত আরোগ্য লাভ করেছেন ২,৩৩,৬৫৭ জন। বর্তমানে করোনার সক্রিয় রোগীর সংখ্যা ৫২,৩৫৮ জন। এর মধ্যে আইসিইউতে আছেন ৬৭৪ জন এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ৪,২৪৫ জন। বাকীরা নিজ নিজ বাড়িতে আইসোলেশনে আছেন।

 14,358 total views,  1 views today