ক্লাব বার্সেলোনা থেকে সুপারস্টার লিওনেল মেসির কান্নাভেজা বিদায়

 কবির আহমেদ, স্পোর্টস ডেস্ক: মেসির সাথে বার্সেলোনার চুক্তি শেষ হয়েছে গত ৩০ জুন। বার্সেলোনা ক্লাব কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন মেসির সাথে তাদের আর কোন চুক্তি হয় নাই। আর্জেন্টিনার জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক ও বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সুপারস্টার লিওনেল মেসি দীর্ঘ ২১ বছর বার্সেলোনার ছাড়ছেন।

মেসি রবিবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে কান্নাজড়িত কন্ঠে তার বিদায়ের কথা নিজেই জানিয়েছেন। ফলে স্পেনের বার্সেলোনায় শেষ হলো এই বিশ্ব ফুটবলারের এক বর্ণিল অধ্যায়!

বার্সেলোনা ছেড়ে দিলেন লিওনেল মেসি। শত চেষ্টা করেও বার্সেলোনা ধরে রাখতে পারল না নিজেদের ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় কে। যে ক্লাবে বেড়ে ওঠা, যে ক্লাব দিয়েছে পরিচিতি, সে বার্সার জার্সিতে আর দেখা যাবে না আর্জেন্টিনায় জন্মগ্রহণকারী এই ফুটবলের রাজপুত্রকে। মাত্র ১৩ বছর বয়সের তিনি আর্জেন্টিনার রোজারিও থেকে আসেন স্পেনের বার্সেলোনায়। এখানেই তিনি পেয়েছেন বিশ্বসেরার খেতাব। ক্যারিয়ারের ইতি টানতেও চেয়েছিলেন এই বার্সেলোনায়। তবে বাস্তবতা যে বড়ই নিষ্ঠুর। বৈশ্বিক মহামারী করোনায় স্তব্ধ বিশ্ব। ফলে ইউরোপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে সাথে ফুটবল ক্লাবগুলিও পড়েছে অর্থনৈতিক মন্দায়। এই বছরের ৩০ জুন বার্সেলোনার সাথে চুক্তি শেষ হয় লিওনেল মেসির। নতুন চুক্তি কবে সম্পাদন হবে তা নিয়ে চলতে থাকে ব্যাপক আলোচনা-আলোচনা এবং সমালোচনা। যদিও আরো কয়েকটি বছর স্পেনের এই কাতালান রাজ্যে থাকার কথা মৌখিক জানিয়ে মেসি চলে যান কোপা আমেরিকায় খেলতে। ব্রাজিল থেকে শিরোপা জয় করে এরপর পরিবার সহ তাঁর গন্তব্য যুক্তরাজ্যে। সেখান থেকে স্পেনের ইভিজায় ছুটি কাটিয়ে মেসি বার্সেলোনায় ফিরেছিলেন নতুন চুক্তি সই করতে। কথা ছিল বৃহস্পতিবারই নতুন পাঁচ বছরের চুক্তি সই করবেন; সেটাও আগের তুলনায় অর্ধেক বেতনে। সবকিছুই ঠিক ছিল কিন্তু হঠাৎ করেই ১৮০°ডিগ্রির মত সবকিছু বদলে গেল।

বৈশ্বিক মহামারীর কারনে স্পেনের শীর্ষ স্থানীয় ফুটবল ক্লাব সমূহ ভীষণ অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। আর তারই ধারাবাহিকতায় ক্লাবের অর্থনৈতিক দুরাবস্থা দূর করতে ২,৭ মিলিয়ন ইউরোতে লা-লিগার ১০ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে দেয় ক্লাব কর্তৃপক্ষ। তাছাড়াও স্পেনের জাতীয় লীগ পরিচালনা কর্তৃপক্ষ। করোনার পরবর্তী অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে দ্রুত পুনরুদ্ধারের জন্য প্রতিটি ক্লাব কর্তৃপক্ষের জন্য যুক্ত করা হয় নতুন কিছু নিয়ম। ঝামেলার শুরু হয় সেখান থেকেই। ক্লাবের বাৎসরিক বেতনের একটা সীমা বেধে দেয়া হয়। নতুন আরোপিত এই বেতন সীমার মধ্যে থাকতে হবে প্রতিটি ক্লাবকে। ফলে স্পেনের জাতীয় লীগ পরিচালনা কমিটির নতুন আইন-কানুনের জটিলতায় বার্সেলোনা ফুটবল ক্লাব আর ধরে রাখতে পারলো না মেসিকে।

বর্তমান বিশ্বের এই শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় লিওনেল মেসিকে ধরে রাখতে না পারাটা বার্সেলোনার ক্লাব কর্তৃপক্ষেরও বড় ব্যর্থতা। গুঞ্জন উঠেছে স্পন্সররা মুখ ফিরিয়ে নেয়ার কথা ভাবছে।

আজ বিদায় বলতে গিয়ে নিজেও কাঁদলেন। কথা বলতে পারলেন না অনেক্ষণ। তবে বিদায়কালে জানালেন আবারও ফিরতে চান বার্সায়।

রবিবার বিকালে এই সাংবাদিক সম্মেলনে কান্নাভেজা চোখে মেসি জানান তার ছোটবেলার ক্লাব বার্সেলোনায় থেকে যাওয়ার পুরো ইচ্ছা ছিল। লা লিগার নতুন নিয়মের কারণে তেমনটা হয়নি। স্বামীর এমন অবস্থায় স্ত্রী আন্তেনেল্লো রোকুজ্জে এগিয়ে আসলেন হাতে টিস্যু নিয়ে। চোখ মুছতে মেসি নিলেন সেটি। অনেকক্ষণ পর কথা বলতে শুরু করলেন আর্জেন্টাইন তারকা। পুরো পৃথিবীকে স্বাক্ষী রেখে বললেন, ‘এটা আমার জন্য অনেক কঠিন’।

তিনি আরও বলেন, আমি ক্লাব ছেড়ে যেতে চাইনি। আমি বার্সেলোনাকে ভালোবাসি এখানেই থাকতে চেয়েছি। আমার চুক্তিও প্রস্তুত ছিল। ছুটি থেকে ফিরে আসার পর সব ঠিকঠাক ছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছু হলো না। জীবনে অনেক হার-জিতের মধ্যে দিয়ে গেছি কিন্তু পরদিন অনুশীলনে নেমে সব ভুলে গেছি। আমি এখানে আর অনুশীলনে আসব না, মাঠে নামব না,এই ক্লাবের হয়ে আর খেলব না। এটাই আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত।

মেসি আরও যোগ করে বলেন, গত বছর আমি ক্লাব ছাড়তে চেয়েছি কিন্তু এই বছর সব পালটে গিয়েছিল। আমি বুঝতে পেরেছি যে এটা আমার ঘর আর আমি বার্সেলোনাকে কতটা ভালোবাসি। ২১ বছর ধরে আমি এখানে আমার স্ত্রী ও তিন আর্জেন্টাইন-কাতালান সন্তানকে নিয়ে থাকি। আমরা আবারও ফিরব। আমার সন্তানদেরও আমি একই কথা দিয়েছি।

সংবাদ সম্মেলনে মেসিকে জিজ্ঞেস করা হয় তার নতুন ঠিকানা নিয়ে। পিএসজির(প্যারিস) পক্ষ থেকে মেসির যোগদান মোটামুটি নিশ্চিত করা হলেও আর্জেন্টাইন অধিনায়ক জানালেন এখনও কোনো কিছুই চূড়ান্ত নয়।

তিনি বলেন, সম্ভাবনা আছে কিন্তু কোনো কিছুই চূড়ান্ত নয়। বার্সেলোনার সঙ্গে থাকছি না এই ঘোষণার পর অনেকগুলো ফোন কল পেয়েছি। অনেকগুলো ক্লাবই নিতে চেয়েছে। চূড়ান্ত হয়নি কোনো কিছু। অনেকের সঙ্গেই আলোচনা চলছে।

২০০০ সালে বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হন মেসি। ২০০৪ সালে সুযোগ পান বার্সার মূল দলে। এরপর প্রায় ১৭ বছর এক ক্লাবেই আছেন মেসি। বার্সার জার্সিতে ৭৭৮ ম্যাচে ৬৭২ গোল করেছেন। সাফল্যে মোড়ানো ক্লাব ক্যারিয়ারে মেসি জেতেন ৪টি উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ ও ১০টি লিগ শিরোপাসহ ৩৫টি ট্রফি।

 14,563 total views,  1 views today