গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নকশীকাঁথা

 নুরুল আমিন, ইউরো সমাচার প্রতিবেদকঃ নকশীকাঁথা একটি ঐতিহ্যপূর্ণ সেলাই শিল্প। এটি বাঙালি সংস্কৃতির একটি অংশ। ভারতের কিছু এলাকা ও বাংলাদেশে বাঙালি ইতিহাস ঐতিহ্যের নকশীকাঁথা সেলাইয়ের প্রচলন ও প্রবনতা দেখা যায়। মনের মাধুরী মিশিয়ে লাল, নীল, হলুদ প্রভৃতি রংবেরঙের সুতায় কাপড়ের ওপর সুঁইয়ের আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলা হয় নানা ধরনের আল্পনা, ফুল, পাখি ও লতাপাতার ছবি। চিত্তাকর্ষক এসব লাবণ্যময় বাহারী চিত্র দেখে চেনা যায় নকশীকাঁথা। বাঙালির জন্য এটি খুব গৌরবের।                                          

এটি সাধারণত বর্ষাকালে সেলাই করা হয়। তবে বছরের বিভিন্ন সময় বাঙালি নারীদের নকশীকাঁথা সেলাই করতে দেখা যায়। গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে যেন নকশীকাঁথা সেলাইয়ের উৎসব বয়ে যায়। ঈদের দিনেও নকশী কাঁথা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে গাঁয়ের দুলালী মেয়ে। এভাবেই চিরায়ত বাংলার ঐতিহ্য নকশী কাঁথা যুগ যুগ ধরে প্রাণবন্ত হয়ে আছে। বিশ্বব্যাপী অর্জন করেছে কিংবদন্তীর সুনাম।  শিশুকাল থেকেই গ্রামবাংলার মেয়েদের নকশীকাঁথায় হাতেখড়ি হয়। সুঁই-সুতার সঙ্গে গড়ে ওঠে গভীর মিতালী।                                                 

১ আগস্ট শনিবার পবিত্র ঈদুল আযহার দিন বিকেলে ঘর থেকে বাজারে যেতে তৈরি হচ্ছিলাম। এমন সময় চোখে পড়লো আমার অবুঝ ছোট্ট শিশুকন্যা ইকরা ঘরের দাওয়ায় চৌকিতে বসে আপন মনে সুঁই-সুতায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তার ছোট ছোট হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নকশীকাঁথা সেলাই করছে। আমি অমনি ছবি করলাম। মোবাইল ক্যামেরার আলোর ঝলক দেখে অমিয় হাসির ঝিলিক ছড়িয়ে চঞ্চলা হরিণীর মতো চোখ তুলে আমার দিকে তাকালো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, মা তুমি কী করছো? বললো, নকশীকাঁথা সেলাই। আমার পুতুলের বিয়ে দিমু। এরপর আবার সে গভীর ধ্যানে নকশীকাঁথা সেলাই করতে শুরু করলো। আমি কিছুক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলাম। অবুঝ হৃদয়ের পুতুলী ইকরা আমার দিকে আর ফিরে চায়নি। আমার মনের দুয়ারে তখন নিভৃতে ভেসে ওঠে গ্রামবাংলার শত শত বছরের ঐতিহ্যের নকশীকাঁথার চিত্র। সেখানে দাঁড়িয়ে লেখাটি শুরু করে দিলাম। আমরা নকশীকাঁথা দেখে খুশী হই। মুগ্ধ হই। কত রকম প্রশংসা করি।                           

প্রাচীন আমল থেকে নকশীকাঁথা বাঙালির ইতিহাস ঐতিহ্যের স্বাক্ষর বহন করছে। বাঙালির প্রাণে প্রাণে মিশে আছে নকশীকাঁথার সৌন্দর্য। বাঙালি নারীর নিখুঁত রুচি আর নিখাঁদ ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে নকশীকাঁথা। এটি বাঙালি নারীর প্রাণের স্পন্দন। এর সঙ্গে রয়েছে বাঙালি নারীর হৃদয়ের নিবিড় সখ্যতা। নকশীকাঁথা আর বাঙালি রমনীর জীবন যেন প্রাণে প্রাণে একাকার। এক একটি নকশীকাঁথা এক একটি ইতিহাস। হতে পারে হাজারো জীবনের ইতিহাস। নকশীকাঁথার প্রতিটি ফোঁড়ে জড়িয়ে আছে কত সুখ-দুঃখের কথা, কত জীবনের কথা, কত হাসি, কত কান্না, কত চোখের নোনা জল, কত হারানো বেদনার হাহাকার, কত জীবনের কত বিবর্ণ কথা, কত আবেগ কত সুরের মূর্ছনা, কত রমনীর বক্ষ ছেঁড়া করুন আর্তনাদ, কত যুগ-জনমের হতাশা ব্যর্থতার গোপন চিত্র, কত প্রেম ভালবাসার নিবেদন, কত বিরহীনির কত বিরহ যন্ত্রণা, কত রমনীর প্রাণের গহীন উচ্ছ্বাস! সেই সবের খবর কে আর রাখে। নকশীকাঁথা দেখে চোখ জুড়ায়, মন ভরে। প্রতিটি নকশীকাঁথার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালিয়ানা।                              

নকশীকাঁথার বাইরের সৌন্দর্য যতটা বিচিত্র, এর ভেতরের গল্প তার চেয়ে হাজার গুণে বেশি আবেগময়, বেদনাবিধুর, চমকপ্রদ ও তাৎপর্যপূর্ণ। নকশীকাঁথার মাঠ হচ্ছে বাঙালি নারীর প্রাণ আর সৌন্দর্য হচ্ছে বৈচিত্র্যময় জীবনের বৈচিত্র্যময় প্রতিচ্ছবি। প্রেম আর প্রকৃতি এখানে অবিচ্ছেদ্য সেতু বন্ধন। নকশীকাঁথার ফোঁড়ে বৈচিত্র্য আছে। ছোট-বড় ফোঁড়কে গাঁয়ের বধূরা চাটাই ও কাইত্যা ফোঁড় বলে। ফোঁড়ে ফোঁড়ে নিপুণ কারিগরের নৈপুণ্যতা ও দক্ষতা বর্ণিল তরঙ্গে বয়ন ভঙ্গির প্রকাশ ঘটে। রূপসী বাংলার লোকশিল্প ও লোকজ সংস্কৃতির একটি অমূল্য সম্পদ নকশীকাঁথা। গাঁয়ের বধূরা কাজের ফাঁকে সখের বশে জামাই বা ননদীকে উপহার দেয়ার জন্য নকশীকাঁথা সেলাই করে থাকে। একেবারে অল্প খরচে মহামূল্যবান চমৎকার নকশীকাঁথা তৈরি করা হয়। বাংলাদেশের সব অঞ্চলে নকশীকাঁথা সেলাই করতে দেখা যায়। তবে ময়মনসিংহ, রাজশাহী, ফরিদপুর ও যশোর নকশীকাঁথার জন্য বিখ্যাত।                       

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য ২০০৮ সালে ঐতিহ্যবাহী নকশীকাঁথার ভৌগোলিক স্বীকৃতি পায়। তখন বাংলার মানুষ খুব দুঃখ প্রকাশ করেছেন। বাংলা সাহিত্যে নকশীকাঁথার যথেষ্ট প্রভাব পড়েছে। বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত পল্লীকবি জসিম উদ্দিনের লেখা একটি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থের নাম নকশীকাঁথার মাঠ। প্রায় পাঁচ-ছয়শ আগে সর্বপ্রথম প্রসিদ্ধ লেখক কৃষ্ণদাস কবিরাজ রচিত শ্রী শ্রী চৈতন্য চরিতামৃত বইয়ে কাঁথার কথা উল্লেখ পাওয়া যায়। কাঁথা শব্দের উৎপত্তির সঠিক তথ্য জানা যায়নি। তবে নকশীকাঁথা সেলাইয়ের প্রচলন বা উৎপত্তি বাংলার প্রান্তর ও বাঙালি থেকে থেকে হয়েছে। এটি বাঙালি নারীর প্রিয় কাজ। নকশীকাঁথা সেলাইয়ের নির্দিষ্ট কোন নকশা নেই। নকশীকাঁথাকে বলা যায়, পল্লী বাংলার পল্লী বালার মনের ডাইরি। বিভিন্ন এলাকায় সেলাইয়ের ধরন অনুযায়ী লহরী, আনারসি, সুজনী ও বাঁকা প্রভৃতি নামে নকশীকাঁথার নাম রাখতে দেখা যায়।

এক একটি নকশীকাঁথা সেলাই করতে এক-দুই বছর কিংবা আরও বেশি সময় লেগে যায়। নকশীকাঁথায় ইতিহাস, ঐতিহ্য, আবেগ, অনুভূতি, ধর্মীয় বিশ্বাস, সংস্কৃতি, রুচি, স্থান, কাল, অর্থনীতি, প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপর যথেষ্ট প্রভাব ও বিচিত্রিতা লক্ষ্য করা গেছে। নকশীকাঁথা বাংলার একটি সম্ভাবনাময় সম্পদ। আবহমান বাংলার ঐতিহ্যের নকশীকাঁথা যেন হারিয়ে না যায়, সেজন্য জাতীয় পর্যায়ে উদ্যোগ নেয়া একান্ত প্রয়োজন। হাতে বোনা নকশীকাঁথা বিক্রি করে স্বাবলম্বী হতে পারে একটি পরিবার। বিশ্বের দরবারে বাংলার গাঁয়ের বধূর জীবনগাথা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আল্পনাভরা নকশীকাঁথার সৌন্দর্যে দীপ্তিময় গৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশ।                                        

লেখক : নুরুল আমিন, সাংবাদিক, কলামিস্ট, কবি, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক, লালমোহন, ভোলা। nurulamin911@gmail.com, 01759648626.

 6,941 total views,  2 views today