সম্পাদকীয়

আজ শোকাবহ ১৫ আগস্ট শুক্রবার ১৫ আগস্ট ৭৫ সাল।

ফজরের আযান শুরু হয়েছে মাত্র। রাতের অন্ধকারের শেষ রেশ টুকু ফিকে হয়ে আসতে শুরু করেছে। সেই কালো রাতে ঘাতকের দল এগিয়ে এলো ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকান্ড ঘটাবার জন্যে। আজ সেই অভিশপ্ত শোকাবহ রক্তাক্ত ১৫ আগস্ট। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি,হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৩৯তম শাহাদাত বার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস।

সারা জাতি আজ শোকে মুহ্যমান,বেদনায় নীরব, নিস্তব্ধ। ১৯৭৫ সালের এমনি এক অভিশপ্ত দিনের সুবেহ সাদেকে একদল তস্কর খুনী, দুস্কৃতকারী, পাষন্ড এয়াজীদের বংশধর নিমকহারাম মীর জাফরের প্রেতাত্মা রাজধানী ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নম্বর রোডের ঐতিহাসিক বঙ্গবন্ধু ভবনে হানা দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে বাঙালি জাতির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান কাংখিত পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব,তার প্রিয়তমা স্ত্রী বাঙালির স্বাধীকার সংগ্রামের অন্যতম প্রেরণাদাত্রী নারী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, তাদের বড় ছেলে বীর মুক্তিযোদ্ধা বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক শেখ কামাল, মেঝো ছেলে বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ জামাল, ছোট ছেলে কিশোর শেখ রাসেল, পুত্রবধু সুলতানা কামাল ও রোজী জামালকে।
একই রাতে তস্কর খুনী দল হানা দেয় বঙ্গবন্ধু সরকারের তৎকালীন মন্ত্রী অবিসংবাদিত কৃষক নেতা আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের মিন্টো রোডের সরকারী বাসভবনে। সেখানে হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, তার কিশোর ছেলে আরিফ, কিশোর মেয়ে বেবী, নাতী ছোট শিশু সুকান্ত আব্দুল্লাহ, ভাইয়ের ছেলে শহীদ সেরনিয়াবাত ও আত্মীয় আবু নাঈম রিন্টুকে।

মারাত্মকভাবে আহত করে বঙ্গবন্ধুর আদরের বোন মন্ত্রী সেরনিয়াবাতের স্ত্রীকে। তস্কর চক্র আরো হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে এবং জাতীয় যুবলীগের তৎকালীন চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মণি এবং তার অন্তঃসত্বা স্ত্রী বেগম আরজু মণিকে। বঙ্গবন্ধুর আহবানে তাকে রক্ষা করতে এলে ৩২ নম্বর রোডের মুখে ঘাতক চক্র আরো হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর এককালীন সামরিক সচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্ণেল জামিলকে। পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম ও বর্বরোচিত এই হত্যাকান্ডে ঘাতকচক্র একই রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ তার পরিবারের ১৬ জন সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করার মধ্য দিয়ে বাঙালির স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিপরীত দিকে প্রবাহিত করার কাজ শুরু হয়। ৭৫-এর ১৫ আগস্টের সুবেহ সাদেকে বাঙালির নয়নমণি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবারের নির্মম হত্যাকান্ডের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় কারবালা প্রান্তরে ইমাম হোসেন (রাঃ) এবং তাঁর পরিবারের মর্মান্তিক হত্যাকান্ড। স্মরণ করিয়ে দেয় ২৩ জুন, ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে পাতানো যুদ্ধের পরাজয়ের পর বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর চক্রের হাতে মুর্শিদাবাদে নির্মমভাবে শহীদ বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা এবং তাঁর পরিবারের বিয়োগান্তক ঘটনা। আব্রাহাম লিংকন বলেছিলেন, Some people can be fooled for some time, But all people can not be fooled for all time (কিছু সময়ের জন্য কিছু লোককে হয়তো বোকা বানানো যায়, কিন্তু সব লোককে সব সময়ের জন্যে বোকা বানানো যায় না)।

বঙ্গবন্ধুর হত্যার সকল দুরভিসন্ধির সাথে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদী ও পাকিস্তানী চক্র এবং তাদের এ দেশীয় দালালদের গোপন আতাতের কথা আজ দেশের মানুষের কাছে পরিস্কার হয়ে গেছে। আজ মানুষ বুঝতে পেরেছে বঙ্গবন্ধু হত্যার উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে বাংলাদেশের নাম চিরতরে মুছে ফেলবে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে। কিন্তু তাদের সেই বিশ্বাসঘাতকতা, উচ্চবিলাসী ধ্যানধারণা বাস্তব রূপ লাভ করেনি। সূর্য অস্তমিত হলেই তারপর জোনাকিরা জ্বলে। কিন্তু জোনাকিরা কখনোই সূর্যের বিকল্প হতে পারে না। যতোই দিন যাচ্ছে এ সত্য স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার বদলা নিতে হলে তার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকদের নতুন করে শপথ নিতে হবে। নূতন প্রত্যয়ে বলীয়ান হয়ে শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে এবং বঙ্গবন্ধুর কাক্সিখত অর্থনৈতিক মুক্তি এনে দিতে পারলেই জাতিরজনক বঙ্গবন্ধুর বিদেহী আত্মা শান্তি পাবে। বাংলার মানুষ জাতিরজনক বঙ্গবন্ধুর হত্যার রায়ের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন চায়। আর তা-ই হবে তার প্রতি কৃতজ্ঞ জাতির সর্বোৎকৃষ্ট সম্মান প্রদর্শন। করোনা কালীন এই মহামারীতে আমরা ১৫ আগস্ট ৭৫ এর কালোরাতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতাসহ নির্মমভাবে নিহতদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত ও জান্নাত কামনা করছি।

ঈদুল আযহা করোনায় কেড়ে নিল আনন্দ, শুধু নিরানন্দেই কাটবে দিন !

আগামী ৩১ জুলাই ২০২০ইং শুক্রবার সৌদি আরব এবং ইউরোপসহ মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ দেশে পবিত্র ঈদুল আযহা। করোনার দুর্যোগে গোটা বিশ্ব বিপর্যস্ত। মৃত্যুর মিছিলের মধ্য দিয়ে হাঁটছি আমরা। স্বজন হারানো ব্যাথায় কাতরাচ্ছে দুনিয়া। তারপরও অবিরাম চলেছি এই দুর্যোগ মোকাবেলায়। করোনা মহামারী হয়তো একদিন এই মানুষের কাছেই নতি স্বীকার করবে। ততোক্ষণে আমাদের অনেক কিছু হারাতে হবে। করোনার সঙ্গে সঙ্গী হয়েই আগামী দুঃসময় পাড় করবো আমরা প্রিয়জনকে কোনভাবেই কাছাকাছি থেকে জড়িয়ে ধরা যাবে না। করোনা আমাদের এতটাই বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। প্রিয় স্বজনের নিঃশ্বাসকেও আমরা আজ বিশ্বাস করতে পারছি না। তারপরও আমরা শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখেই সবার মঙ্গল কামনা করবো। বিশ্বের সব মানুষের মুক্তির কথা বলবো।

মহান আল্লাহতালার উদ্দেশে পশু কোরবানি দেয়ার মহিমান্বিত দিন। আরবি শব্দ ঈদ-এর অর্থ আনন্দ উৎসব এবং আযহার অর্থ পশু জবাই করা। মুসলমানদের জন্য ঈদুল আযহা একই সঙ্গে পশু কোরবানি দেয়ার এবং উৎসব করার দিন। কোরবানির উদ্দেশ্য আল্লাহতা’লার নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জন করা। কোরবানি দেয়ার প্রথম নির্দেশ এসেছিল মুসলিম জাতির পিতা হজ্বরত ইবরাহিম (আ.)-এর কাছে। তিনি আল্লাহকে বেশি ভালোবাসেন ও মান্য করেন, নাকি সন্তান গুরুত্ব তাঁর কাছে বেশি- সেটা পরীক্ষা করাই ছিল উদ্দেশ্য। এজন্য তাঁকে আদরের পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে আল্লাহতা’লার উদ্দেশে কোরবানি করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। নির্দেশ অনুযায়ী ইবরাহিম (আ.) প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, ইসমাইল (আ.)-ও সানন্দে সম্মত হয়েছিলেন। দেখে সন্তুষ্ট হয়েছিলেন আল্লাহ। পুত্রের গলদেশে ছুরি চালানো শুরু করার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে ইবরাহিম (আ.)-কে এই সন্তুষ্টির কথা জানিয়ে বলা হয়েছিল, তিনি যেন ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি পশু কোরবানি দেন। সে অনুযায়ী পশুই কোরবানি দিয়েছিলেন হজ্বরত ইবরাহিম (আ.)। সেই থেকে পশু কোরবানির মধ্য দিয়ে মুসলমানরা পবিত্র ঈদুল আযহা উদযাপন করে আসছেন। বিধানটি চূড়ান্ত হয়েছে শেষ রাসূল হজ্বরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে।

দিনটি উপলক্ষে পশু কোরবানিই অবশ্য একমাত্র করণীয় নয়। তার আগে পবিত্র হজ্ব কে মুসলমানদের জন্য ফরজ বা অবশ্যপালনীয় করা হয়েছে। হজ্ব পালিত হয় হিজরি সালের শেষ মাস জিলহজ্ব মাসে। এ উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মুসলমানরা গিয়ে পবিত্র নগরী মক্কা মুকাররমায় সমবেত হন। ৮ জিলহজ্ব থেকে তিন দিন ধরে তারা মিনা, মুযদালিফা ও আরাফাতের ময়দানসহ নির্ধারিত স্থানগুলোতে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। বলতে থাকেন, লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক। অর্থাৎ হে আল্লাহ, আমি হাজির হয়েছি। তারপর আল্লাহর ঘর পবিত্র কাবায় গিয়ে চারদিকে সাতবার ঘুরে তাওয়াফ করতে হয়। সাঈ করার জন্য যেতে হয় সাফা ও মারওয়া নামের দুটি পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে, যেখানে শিশু ইসমাইল (আ.)-কে পানি খাওয়ানোর জন্য মা হাজেরা ছুটোছুটি করেছিলেন এবং যেখানে আল্লাহর কুদরতে তৈরি হয়েছিল জমজম কূপ। সাতবার সাঈ করার তথা সাফা ও মারওয়ার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াত করার পাশাপাশি আবে জমজম বা জমজমের পানিও পান করেন হজ্বকারীরা। সবশেষে আসে কোরবানির পালা, উদযাপিত হয় ঈদুল আযহা। পবিত্র এ দিনটিতে পশু কোরবানি দেয়ার আগে দু রাকাত ওয়াজিব সালাত তথা নামায আদায় করতে হয়।

এবছর হজ্ব পালিত হবে বৃহস্পতিবার। সৌদি আরব এবং ইউরোপসহ মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ দেশে শুক্রবার উদযাপিত হবে ঈদুল আযহা । বলা দরকার, ঈদুল আযহা কেবলই পশু কোরবানি দেয়ার এবং উৎসব করার দিন নয়। দিনটির প্রধান উদ্দেশ্য মুসলমানদের মধ্যে আল্লাহতা’লার প্রতি পরিপূর্ণ ভালোবাসা ও আনুগত্য তৈরি করা এবং স্বার্থচিন্তার উচ্ছেদ করে আত্মত্যাগের শিক্ষা দেয়া। আল্লাহতা’লার কাছে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সমর্পণ করাই ঈদুল আযহার প্রকৃত শিক্ষা। সুতরাং কেবলই পশু কোরবানি দেয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকার পরিবর্তে মুসলমানদের উচিত নিজেকে আল্লাহতা’লার কাছে সম্পূর্ণরূপে সমর্পণ করার এবং তাঁর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা। একই কারণে পশু কেনা উচিত সৎপথে উপার্জিত অর্থ দিয়ে। পশুর গোশ্ত যত বেশি সম্ভব আত্মীয়-স্বজন ও গরিবদের মধ্যে বিলিয়ে দেয়ার মধ্যেও কল্যাণ রয়েছে। এভাবে সব মিলিয়েই কোরবানি তথা আত্মত্যাগ করার শিক্ষা দেয় পবিত্র ঈদুল আযহা। আমরা আশা করতে চাই, বাংলাদেশের মুসলমানরাও দিনটির মূল শিক্ষাগুলো অনুধাবন করবেন এবং চেষ্টা করবেন যাতে প্রতিবেশি ও স্বজনসহ অন্যরাও উৎসবে শরিক হতে পারেন।যদিও এ বছর মহামারী করোনার জন্য এ উৎসব সম্ভব হবেনা, তবুও মহান রাব্বুল আলামিনের নিকট প্রার্থনা করি এই ঈদুল আযহার উছিলায় আগামী পৃথিবী যেন করোনা নামের সকল অশুভ ছায়াকে ম্লান করে দিয়ে নির্মল আনন্দে ভরিয়ে দেন,আমিন । পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে দৈনিক ইউরো সমাচারের সকল পাঠক, লেখক, সহকর্মী সংবাদদাতা, শুভানুধ্যায়ীসহ দেশবাসীর প্রতি আমাদের আন্তরিক শুভেচ্ছা এবং ঈদ মোবারক ।

ইউরো সমাচারের ফেলে আসা এক বছর

গত বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালের ১০ জুলাই ইউরো সমাচার আলোর মুখ দেখেছিল। চোখের পলকে একটি বছর পার হয়ে গেল। বহু চড়াই-উতরাই, আনন্দ-বেদনার সব স্মৃতি আজ আনমনা করে তোলে। এই চলার পথে সংগ্রামটা গুরুত্বপূর্ণ,এবং সফলতা পেরিয়েই সার্থকতা। একে অন্যের পরিপূরক। এর মধ্য দিয়েই পূর্ণতা পায় জীবনের বৃত্ত। পৃথিবীতে অনেক উদ্যোগ ও চেষ্টা কম-বেশি সফল হয়, কিন্তু সার্থক কাজ সে-তুলনায় খুবই কম। সার্থক হতে হলে উদ্দেশ্য হতে হয় সুন্দর এবং সমাজ-সংস্কৃতিতে এর গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠা জরুরি। ইউরো সমাচার প্রকাশের পেছনে আমাদের এবং সহকর্মীদের এই চেতনা ও প্রতিজ্ঞা সব সময় সক্রিয় রাখতে হয়েছে। জানি না কতোটা সার্থক হতে পেরেছি আমরা। সে-বিচারের ভার শুধু আপনাদেরই হাতে। আপনারা কেবল পাঠক নন, বৃহৎ পরিবারেরই অংশ এবং পথপ্রদর্শকও।

সর্বোপরি সময়। এর চেয়ে বড় অংশীদার, বড় বিচারক আর কিছু হতে পারে না। তাই সময়ের সঙ্গে থাকি, সামনেও থাকতে চাই। আবারও সময়কে শিরোধার্য করা হয়েছে আগামী দিনের জন্য। এখনকার এবং ভবিষ্যতের যে ডিজিটাল প্রজন্ম, তার সংস্কৃতি, প্রয়োজন আর চিন্তাধারার বাহক । সারা দুনিয়া আজ মহামারী করোনায় আক্রান্ত । একে উপেক্ষা করার উপায় আছে কি?

অন্যের নয়, নিজেদের ঐশ্বর্যেই উৎসবকে যে আনন্দময় করে তোলা যায়, সেই দৃষ্টান্ত স্থাপনই আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। কিছু অনিয়মিত কথার মধ্য দিয়ে এবারের সম্পাদকীয় শুরু করেছিলাম। দু-চারটা কথার সুবাদে আপনাদের সঙ্গে এখানে আরেকটু থাকতে চাই। মনে রাখবেন, জীবন খুব ছোট, কিন্তু পৃথিবীটা অনেক বড়। মানুষ আরও বড় ও অফুরন্ত। যা কিছুই করি না কেন, তাতে যদি মানুষের কল্যাণ মর্মে রাখি, হৃদয়ে লালন করে চলি; উপলব্ধ হবে জীবন অনেক বড় হয়ে উঠেছে আর পৃথিবী হয়ে এসেছে ছোট। এ-জায়গায় যে পৌঁছতে পারে, সে-ই সব থেকে সার্থক। এই দায়িত্ববোধ আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়ে আমাদের আশাবাদী করে।

আমাদের সব সময়ই চেষ্টা থাকে সত্য সংবাদ উপহার দিতে, কতটুকু পেরেছি সেই বিচারের ভার আপনাদের উপর। বাংলাদেশের তথা বাংলাভাষা নিয়ে সুদূর ইউরোপ থেকে আমাদের আত্মপ্রকাশ । অতএব, এখন থেকে প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ আমরা আছি আপনাদেরই সঙ্গে।

পরিশেষে প্রত্যাশা, ফেলে আসা ১টি বছরের মতো সামনেও আপনারা থাকবেন ইউরো সমাচার পরিবারের পাশে। সঙ্গী হবেন আমাদের প্রতিটি উদ্যোগে।

আনন্দের ঈদ নিরানন্দে ভরা।
করোনার দুর্যোগে গোটা বিশ্ব বিপর্যস্ত। মৃত্যুর মিছিলের মধ্য দিয়ে হাঁটছি আমরা। স্বজন হারানো ব্যাথায় কাতরাচ্ছে দুনিয়া। তারপরও অবিরাম চলেছি এই দুর্যোগ মোকাবেলায়। করোনা মহামারী হয়তো একদিন এই মানুষের কাছেই নতি স্বীকার করবে। ততোক্ষণে আমাদের অনেক কিছু হারাতে হবে। করোনার সঙ্গে সঙ্গী হয়েই আগামী দুঃসময় পাড় করবো আমরা। তারপর পৃথিবী থাকবে। থাকবে মানুষের ভালোবাসা। এত মৃত্যু, এত দুঃখ-কষ্ট তারপরও এসেছে ঈদুল ফিতর। আনন্দের ঈদ নিরানন্দে ভরা। তার মধ্যেই আছি আমরা। তবুও ঈদের শুভেচ্ছা সবাইকে। ইউরো সমাচার,ফেসবুক লাইভের সকল দর্শক, সাংবাদিক সহকর্মী এবং সকল শুভান্যুায়ীদের ঈদ মোবারক।
করোনায় কেড়ে নেওয়া প্রাণগুলো জানুক, আমরা কেবল ঈদের দিনটি অতিবাহিত করে চলেছি। আনন্দেও আমরা আজ অশ্রু ঝরাচ্ছি, সারা পৃথিবীর স্বজন হারানোদের জন্য। তোমরা যারা করোনার গহ্বরে হারিয়ে গেছো, তোমাদের প্রতি আগামী সুন্দর পৃথিবীর ভালোবাসা। আর যারা সম্মুখ সারিতে থেকে করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করে করে প্রাণ দিয়েছো, তোমাদের প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা। তোমরা হচ্ছো গোটা দুনিয়ার বীর করোনা যোদ্ধা। আজ ঈদের দিনে আমরা তোমাদের অন্তর দিয়ে স্মরণ করি ।
আজ আমাদের ঈদের জামাতে সামিল হবার কথা। কাতারবন্দি হয়ে নামাজ আদায় করার কথা ছিল। কিন্তু করোনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় কেবল শারীরিক দূরত্বে থেকে নিয়ম পালনের নামাজ পড়ার চেষ্টা করছি। প্রিয়জনকে কোনভাবেই কাছাকাছি থেকে জড়িয়ে ধরা যাবে না। করোনা আমাদের এতটাই বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। প্রিয় স্বজনের নিঃশ্বাসকেও আমরা আজ বিশ্বাস করতে পারছি না। তারপরও আমরা শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখেই সবার মঙ্গল কামনা করবো। বিশ্বের সব মানুষের মুক্তির কথা বলবো। বলবো, মহান রাব্বুল আলামিনের নিকট প্রার্থনা, পৃথিবী থেকে যেন দ্রুত করোনা নামের হন্তারকের বিদায় হয়। আমরা যেন সামাজিকভাবে মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধ রচনা করতে পারি।
আজ ঈদের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের জন্মদিন মিলেমিশে একাকার। আজ আমাদের ঈদ শুরু হয়েছে ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে, এলো খুশির ঈদ’ কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই অমর গান দিয়ে। আজ আমাদের বিদ্রোহের কবি, প্রেমের কবি, আশার কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২১তম জন্মবার্ষিকী। কিন্তু না, জাতীয় কবি হলেও আমরা তাঁর জন্মদিনও পালন করতে পারবো না। কারণ সেখানেও করোনার হানা। তাই তাঁর ওই গান গেয়ে গেয়ে আমরা ঈদের দিনটি অতিবাহিত করতে চাই। একই সঙ্গে চাই, আগামী পৃথিবী যেন করোনা নামের সকল অশুভ ছায়াকে ম্লান করে দিয়ে নির্মল আনন্দে ভরিয়ে দেয় আমাদের। সেই প্রত্যাশা রেখে আবারো সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। ঈদ মোবারক।

আজ ভয়াল ২৫ মার্চ, বাঙ্গালীর ইতিহাসের কালরাত । জাতীয় গণহত্যা দিবস। নিরীহ বাঙালির ওপর হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো বর্বর গণহত্যার ভয়াবহ স্মৃতিজড়িত ইতিহাসের এক অধ্যায়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) স্বাধীনতা আন্দোলনকে দমিয়ে দেওয়ার জন্য অপারেশন সার্চলাইট নামে একটি সামরিক অভিযানের মাধ্যমে দেশের প্রধান শহরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য বাঙ্গালীদের ওপর গণহত্যা চালায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। অভিযান শুরু করার পূর্বে সকল বিদেশি সাংবাদিকদের পূর্ব পাকিস্তান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। বাঙালিদের ওপর আক্রমণের পর গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয় এবং বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী কর্তৃক অপারেশন সার্চলাইটে নিহত ও আক্রান্তদের স্মরণে ২০১৭ সালের ১১ মার্চ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ২৫শে মার্চকে “গণহত্যা দিবস” হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয় । আমরা এই দিবসে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি,সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং মুক্তিযুদ্ধের শহীদ ও নির্যাতিত মা-বোনকে, যাঁদের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা।

যাত্রা হোল শুরু, অন লাইন পত্রিকা “ইউরো সমাচার”। ১৯৮৫ সালের গোড়ার দিকের কথা। ঐ সময়ে মনে করে ছিলাম, কেউ না কেউ প্রচার বিষয়ক শুভ কাজটি করে ফেলবেন, কিন্তু না! কেউ এগিয়ে এলো না । এরই মাঝে পেরিয়ে গেল অনেকগুলো বছর। অবশেষে দীর্ঘ বিরতির পর আমাদেরকেই শুরু করতে হলো পত্রিকার কাজ। উল্লেখ্য ২০০৫ সালে অষ্ট্রিয়া থেকে প্রথম পত্রিকা প্রকাশিত হয় আবিদ হোসেন খান তপন এবং নাসরিন নাহীদ এর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়। “ইউরো সংবাদ” নামে প্রথম ছাপানো সংবাদপত্র (মাসিক পত্রিকা ) । চীফ এডিটর এর দায়িত্বে ছিলেন আবিদ হোসেন খান তপন এবং প্রকাশনার দায়িত্বে ছিলেন নাসরিন নাহীদ। এভাবেই সাফল্যের সাথে পথ চলতে থাকে ইউরো সংবাদ। অস্ট্রিয়ার ভূখণ্ড ছাড়িয়ে সমাদৃত হয়ে স্হান করে নেয় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের অনেক দেশে। প্রথম দু’বছর সহস্রাধিক পত্রিকা বিলি করা হয় নানান মাধ্যমে। এতে ভিয়েনাবাসীর আন্তরিকতা ছিল মনে রাখবার মতো। কয়েক বছর পর পাঠকদের চাহিদা অনুযায়ী সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসাবে প্রকাশের চিন্তা ভাবনা শুরু হয়। কাজ ও কিছু এগিয়ে যায়। দুর্ভাগ্যক্রমে চীফ এডিটর আবিদ হোসেন খান তপন অসুস্থ হয়ে পড়ায় চতুর্থ বর্ষে পদার্পণ করতে না করতেই পত্রিকাটি সকল পাঠকদের হৃদয় শূন্য করে মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। অতঃপর পত্রিকাটি সাময়িক ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এরপর লেখক পাঠক ও পত্রিকার সাথে সংশ্লিষ্ট অনেকের তাগিদে কয়েক বারই উদ্যোগ নেয়া হয় পুনঃপ্রকাশের, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ফলপ্রসূ হয়ে উঠেনি। ইউরো সংবাদ পত্রিকাটি প্রকাশের সূচনা লগ্ন থেকেই লেখক, পরিচালক, প্রকাশক ও শুভানুধ্যায়ীদের নিয়ে গঠন করা হয়েছিল অষ্ট্রিয়া বাংলাদেশ প্রেস ক্লাব। সেই থেকেই প্রাণহীন, নিথর “ইউরো সংবাদ” পত্রিকাটির স্মৃতি নিয়েই চলতে থাকে অস্ট্রিয়া প্রেসক্লাব। ভিয়েনার সুশীল সমাজ আবারো ফিরে পেতে চায় ইউরো সংবাদ এর অস্তিত্ব। সকলের চাওয়া পুঞ্জীভূত হয়েছে একটি সীমান্তে। সময় হয়েছে শক্ত হাতে হাল ধরবার। অস্ট্রিয়া প্রেসক্লাবের লেখক, কবি, কলামিসট, তরুণ সাংবাদিক প্রমুখদের অনুপ্রেরণা নিয়েই অন লাইন পত্রিকা চালু করার সুযোগ এলো। সকলের আন্তরিক আগ্রহের ফসল আজকের ইউরো সমাচার নামের “অন লাইন পত্রিকা।”
বিশেষ করে একঝাক তরুন সাংবাদিক ভিয়েনায় কাজ করতে থাকে। তাদেরকেও সম্পৃক্ত করা হোল প্রেস ক্লাবের সাথে। তাদের অনুপ্রেরণা নিয়েই এই অন লাইন পত্রিকা চালু করার সাহস পাই। এদের মধ্যে অন্যতম হল সোহেল চৌধুরী এবং মাসুক আহমেদ চৌধুরী । তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমেই সদ্য প্রকাশিত হল ইউরো সমাচার নামে এই অন লাইন পত্রিকা। যাদের উৎসাহ পেয়ে এটা বাহির করতে পেরেছি তাদের নাম না বললে অকৃতজ্ঞ হয়ে যাব । এদের অন্যতম হল অল ইউরোপিয়ান বাংলা প্রেস ক্লাবের সাধারন সম্পাদক জনাব বকুল খান, বাংলাদেশ প্রেস ক্লাব ইন বার্সিলোনার সহ সভাপতি জনাব মহিউদ্দিন হারুন, ইউরো বাংলা টি ভির মালিক জনাব আবু তাহির, অল ইউরোপিয়ান বাংলা প্রেস ক্লাবের উপদেষ্টা কবি জনাব আনিসুজ্জামান এবং অষ্ট্রিয়া বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভানেত্রী জনাবা নাসরিন নাহিদ। ইউরো সমাচার পত্রিকার পক্ষ থেকে সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ। পাঠকদের মাঝে যদি সত্য সংবাদ প্রকাশ করতে পারি তবেই আমাদের সাফল্য বয়ে আনবে। সকলের সহযোগিতা কামনা করছি।

 1,936 total views,  1 views today